।। আমার লিটল ম্যাগাজিন জীবন ।।
লেখক এতেল আদনান
অনুবাদ : সুশোভন রায়চৌধুরী
লিটল ম্যাগাজিন আমার কাছে নদীর উৎসের মতো। বিরাট, বিশালাকার পাহাড়ের গা বেয়ে কোনো খরস্রোতাকে দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এতো কিছুই নয়। জল বয়ে চলেছে ওপর থেকে নিচে। হোল্ডারলিনের ' Rhine ' কবিতাটির কথা ভাবুন। শুরুটা কী সুন্দর এক ছোট্টো গর্ত থেকে। লিটল ম্যাগাজিনও ঠিক সেরকমই যার কাজ শুধু কুড়িয়ে চলা, লেখক, কবি বা শিল্পীর সৃষ্টি যা সাহিত্য ও শিল্প হয়ে উঠবে অনেক পরে। আমরা জানি না একটি পত্রিকা কতদিন বাঁচবে। তবু আশা কিন্তু থেকেই যায়। তবে খারাপ লেখা ছাপানোর চেয়ে বন্ধ থাকা অনেক ভালো।
আমার লেখালেখি এই লিটল ম্যাগাজিনকে যাপটে ধরে, সে বেইরুট হোক অথবা নিউ ইয়র্ক। আমার প্রথম লেখা প্রকাশ পেয়েছিল নিউ ইয়র্ক - এর ' দ্য স্মিথ ' এ। পত্রিকাটি পরে বন্ধ হয়ে যায়। যখন ডাকযোগে কোনো লিটল ম্যাগ এসে পৌঁছোয়, মনে হয় যেন সদ্যজাত কোনো শিশু এলো আমার কোলে। লিটল ম্যাগে একটা চার্ম, অননুকরণীয় অ্যাডভেঞ্চার আছে। যত বড়ো হয়, শুরু হয় সম্পাদকীয় পলিসি, গুচ্ছের জটিলতা, তাঁরাও খুঁজতে থাকেন প্রসিদ্ধ নাম। অবশ্য জনপ্রিয়তাই বা আসবে কী করে যদি না একটা জায়গা থেকে শুরু করা যায় ? লিটল ম্যাগাজিন তাই হয়ে ওঠে ঘরের কোণে ভুলে যাওয়া বইয়ের স্তুপের মতো। এমন এক পরিসর যেখানে চোখের পলকে আমরা কতকিছু জানতে ও শিখতে পারি। কুড়ি বছর পর হয়তো দেখছেন, আরে! যে মানুষটার লেখা এতদিন আগে পড়েছিলুম, তিনিই আজ সুপ্রতিষ্ঠিত!
মনে পড়ে, তখন বেইরুটে থাকি। অ্যান্টনি বোল্যাড ' Mauvis Sang ' নামে শুরু করেছিল এক ছোটোকাগজ। আমার কিছু কবিতা দিয়েছিলাম তাঁকে। বেইরুটে তখন লিটল ম্যাগাজিন ' Shi'ir ' এর রমরমা। সম্পাদক ইউসুফ আল- খাল তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে আমূল পরিবর্তন ঘটাচ্ছেন আরবি সাহিত্যের। ১৯৫০-৬০ এর দশকে ' Shi' ir ' পর্যবশিত হচ্ছে ব্র্যান্ডে, আর এই পত্রিকাতে নিজের একটি কবিতা ছাপার অক্ষরে দেখবার স্বপ্নই আমাকে টেনে নিয়ে যায় লেবানন। মনে আছে, বেইরুটের রাস্তায় হাঁটছি হঠাৎই চোখে পড়লো এক আর্ট গ্যালারি - ' গ্যালারি ওয়ান '। তখন কী ছাই জানতুম, যে এটিই ছিল লেবাননের প্রথম শিল্প প্রদর্শশালা যার মালিকানা স্বয়ং সম্পাদক ইউসুফ ও তাঁর স্ত্রী শিল্পী হেলেন- এর! ঢুকতেইশুরু হলো তুমুল কবিতা আড্ডা। আমার কিছু কবিতা শুনে ইউসুফ বললেন, আপনি ' Shi' ir ' এর জন্যে কিছু কবিতা দিন না... কী বলবো বুঝে উঠতে পারিনি। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে আছি দেখে বললেন আপনি আমেরিকাতে কী করছেন ম্যাডাম? এখানে রীতিমতো আন্দোলন চলছে লিটল ম্যাগাজিনকে ঘিরে! তাঁর উদ্দীপনা দেখে বললাম, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কবিতা পাঠিয়েছিলাম, বোধ হয় ডাক গোলযোগে পৌঁছোয়নি । হাতে হাতে দিয়ে দিলুম তিন পিস কবিতা। সেই থেকে ইউসুফের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের সূত্রপাত।
পরবর্তীতে ইউসুফ ও হেলেন গ্যালারি বন্ধ করে, রাস্তার দিকের বেসমেন্ট ভাড়া দিতে শুরু করেন বিভিন্ন শিল্প প্রদর্শনী উপলক্ষে। সিমোন, আমার এক বন্ধু আর আমি তখন মাঝে মধ্যেই ইউসুফের বাড়ি যেতুম আড্ডা দিতে। হুইস্কি ও ওয়াইন সহযোগে আড্ডা গড়াতো প্রায় মাঝরাত্রি। শেষ প্রান্তে হেলেন বলতো চলো গ্যালারির ছবিগুলো একটু দেখে আসি। আমরা ঘোরের মধ্যে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম এক একটা ক্যানভাসের দিকে।
মরোক্কোতে তখন আব্দুললতিফ লাবি- র সম্পাদনায় প্রকাশিত হচ্ছে ফরাসি লিটল ম্যাগাজিন Souffles. আমি প্রথম উত্তর আফ্রিকার মরোক্কোতে যাই জুলাই, ১৯৬৬ তে। তখনও আমি রাবাত শহরে। রাস্তার ফুটপাতে খুঁজে পাই এই পত্রিকা। আরবের বিভিন্ন শহরে বইপত্র মূলত ফুটপাতেই বিক্রি হয়। মানুষ রাস্তাতেই হাঁটু গেড়ে বসে দেখতে থাকেন তাঁদের পছন্দের পত্রিকা। বিক্রি বাটরাও চলে এভাবেই। রাস্তায় বসে যখন Souffles এর কয়েকটা পাতা উলটিয়ে দেখছি মনে পড়ে গেল, বেইরুটে আমার স্কুল জীবনের শিক্ষক, ফরাসি লেখক গেব্রিয়েল বোনো-র কথা। ১৯৫৩ তেই তিনি বেইরুট ছেড়ে চলে যান কায়রো আর কিছু বছর বাদে স্থানান্তরিত হন রাবাতে। পত্রিকায় কোথাও তাঁর নাম লেখা নেই। কিন্তু কেন জানি না, কয়েক লাইন পড়েই মনে হচ্ছিল সম্পাদক নির্ঘাত গেব্রিয়েল স্যারের ছাত্র। তিনি ছিলেন কবিতার মহীরুহ, যাঁর কবিতা পাঠের পদ্ধতি কোনো ভাবেই অ্যাকাডেমিক নয়, পড়ানোর স্টাইলই ছিল আলাদা। Souffles এর প্রকাশিত কবিতাগুলো দেখতে দেখতে মনে হয়েছে ঠিক এরকমই গভীর ও উচ্চমানের কবিতা তিনি আমাদেরকে পড়াতেন। অবশ্য এটাও মনে আছে, লেবানন থেকে তাঁকে ঔপনিবেশিক ফরাসি সরকার বিতাড়িত করেছিলেন, অ্যালজেরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ফ্রেঞ্চ পলিসির সমালোচনা করবার জন্যে।
পত্রিকার ভেতরেই পেয়ে গেলাম ঠিকানা । সেই অনুযায়ী পৌঁছোলাম সম্পাদকের দোরগোড়ায়। ঘড়িতে তখন প্রায় রাত ৮ টা। দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক ফরাসি ভদ্রমহিলা। তিনি ছিলেন আব্দুল লতিফের শাশুড়ি মাতা। জানালেন, সম্পাদক তখন হাসপাতালে, কারণ সেদিনই তাঁর স্ত্রী জন্ম দেবেন তাঁদের প্রথম সন্তানের। অগত্যা, বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম। ন' টা কিংবা তার একটু পরেই হবে, ফিরে এলেন লাবি। বললাম, খুবই দুঃখিত আপনাকে আজকেই বিরক্ত করবার জন্যে। আসলে আগামীকাল আমি ফিরে যাচ্ছি, রাস্তায় আপনার পত্রিকা দেখে মনে হলো, আপনি নিশ্চয়ই গেব্রিয়েল বোনো- র ছাত্র? বললেন, ইয়েস! অফ কোর্স আই অ্যাম!
সেই সময়ে আমরা বিশ্বাস করতাম আরব ঐক্যে। আর আমাদের মতোই Souffles সম্পাদক লাবিও চেয়েছিলেন আরব যুক্তরাষ্ট্র। তাঁকে বলেছিলাম, আমরা সরকারের জন্যে অপেক্ষা করবো না, তৈরি করবো নিজেদের মতো করে এক যুক্তরাষ্ট্র। বললুম, খুব তাড়াতাড়ি আমাকে বেইরুট ফিরতে হবে, তবে সেখানে পৌঁছে আপনার Souffles নিয়ে আলোচনা করবো। পরবর্তীতে সিরিয়ান কবি আদোনিসকে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তাঁর পত্রিকায়। ভালো লাগে, কারণ আমিই তাঁদের মধ্যে তৈরি করেছিলাম সংযোগ। পরে Souffles এর জন্যে আমার Jebu শীর্ষক কবিতার একটা অংশ পাঠিয়েছিলুম। লাবির সঙ্গে আমার বন্ধুত্বে কোনোদিন চিড় ধরেনি।
মরোক্কোতে সেই সময়ে Souffles ভালো প্রভাব ফেলেছিল। ফ্রেঞ্চ- মরোক্কান তরুণ সম্প্রদায়ের প্রায় প্রত্যেকেই লেখালেখি করেছে এই কাগজে। এটিতে রাজনীতিও ছিল পুরো দমে। ফলে সেই সময়ের তরুণ সম্প্রদায় সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে বলেই আমি মনে করি। আমার অন্যতম প্রিয় উত্তর আফ্রিকান কবি মোস্তাফা নিসাবোরি ও তাহার বেন জালুনের কবিতাও প্রকাশিত হয়েছে Souffles এ।
পরবর্তীতে আব্দুল লতিফ লাবি যখন জেলে, আমরা একে অপরকে বহু চিঠি লিখেছি। তাঁর স্ত্রী একবার আমাকে চিঠিতে লেখেন, এঞ্জেলস এর সমগ্র দিয়ে এসেছেন জেলে, লাবি পড়বেন বলে। আমার কাছে দর্শনের বই খুবই কঠিন বলে মনে হয় তাই লাবি কে একবার পাঠিয়েছিলুম রং পেন্সিল আর আঁকার খাতা। লাবি সব সময় বলে, আমাদের বন্ধুত্বের বয়স ঠিক ততটাই যতটা বয়স হবে আমার প্রথম কন্যার।
অনুবাদ : সুশোভন রায়চৌধুরী
লিটল ম্যাগাজিন আমার কাছে নদীর উৎসের মতো। বিরাট, বিশালাকার পাহাড়ের গা বেয়ে কোনো খরস্রোতাকে দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এতো কিছুই নয়। জল বয়ে চলেছে ওপর থেকে নিচে। হোল্ডারলিনের ' Rhine ' কবিতাটির কথা ভাবুন। শুরুটা কী সুন্দর এক ছোট্টো গর্ত থেকে। লিটল ম্যাগাজিনও ঠিক সেরকমই যার কাজ শুধু কুড়িয়ে চলা, লেখক, কবি বা শিল্পীর সৃষ্টি যা সাহিত্য ও শিল্প হয়ে উঠবে অনেক পরে। আমরা জানি না একটি পত্রিকা কতদিন বাঁচবে। তবু আশা কিন্তু থেকেই যায়। তবে খারাপ লেখা ছাপানোর চেয়ে বন্ধ থাকা অনেক ভালো।
আমার লেখালেখি এই লিটল ম্যাগাজিনকে যাপটে ধরে, সে বেইরুট হোক অথবা নিউ ইয়র্ক। আমার প্রথম লেখা প্রকাশ পেয়েছিল নিউ ইয়র্ক - এর ' দ্য স্মিথ ' এ। পত্রিকাটি পরে বন্ধ হয়ে যায়। যখন ডাকযোগে কোনো লিটল ম্যাগ এসে পৌঁছোয়, মনে হয় যেন সদ্যজাত কোনো শিশু এলো আমার কোলে। লিটল ম্যাগে একটা চার্ম, অননুকরণীয় অ্যাডভেঞ্চার আছে। যত বড়ো হয়, শুরু হয় সম্পাদকীয় পলিসি, গুচ্ছের জটিলতা, তাঁরাও খুঁজতে থাকেন প্রসিদ্ধ নাম। অবশ্য জনপ্রিয়তাই বা আসবে কী করে যদি না একটা জায়গা থেকে শুরু করা যায় ? লিটল ম্যাগাজিন তাই হয়ে ওঠে ঘরের কোণে ভুলে যাওয়া বইয়ের স্তুপের মতো। এমন এক পরিসর যেখানে চোখের পলকে আমরা কতকিছু জানতে ও শিখতে পারি। কুড়ি বছর পর হয়তো দেখছেন, আরে! যে মানুষটার লেখা এতদিন আগে পড়েছিলুম, তিনিই আজ সুপ্রতিষ্ঠিত!
![]() |
| Shi'ir এর কিছু প্রচ্ছদ। |
মনে পড়ে, তখন বেইরুটে থাকি। অ্যান্টনি বোল্যাড ' Mauvis Sang ' নামে শুরু করেছিল এক ছোটোকাগজ। আমার কিছু কবিতা দিয়েছিলাম তাঁকে। বেইরুটে তখন লিটল ম্যাগাজিন ' Shi'ir ' এর রমরমা। সম্পাদক ইউসুফ আল- খাল তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে আমূল পরিবর্তন ঘটাচ্ছেন আরবি সাহিত্যের। ১৯৫০-৬০ এর দশকে ' Shi' ir ' পর্যবশিত হচ্ছে ব্র্যান্ডে, আর এই পত্রিকাতে নিজের একটি কবিতা ছাপার অক্ষরে দেখবার স্বপ্নই আমাকে টেনে নিয়ে যায় লেবানন। মনে আছে, বেইরুটের রাস্তায় হাঁটছি হঠাৎই চোখে পড়লো এক আর্ট গ্যালারি - ' গ্যালারি ওয়ান '। তখন কী ছাই জানতুম, যে এটিই ছিল লেবাননের প্রথম শিল্প প্রদর্শশালা যার মালিকানা স্বয়ং সম্পাদক ইউসুফ ও তাঁর স্ত্রী শিল্পী হেলেন- এর! ঢুকতেইশুরু হলো তুমুল কবিতা আড্ডা। আমার কিছু কবিতা শুনে ইউসুফ বললেন, আপনি ' Shi' ir ' এর জন্যে কিছু কবিতা দিন না... কী বলবো বুঝে উঠতে পারিনি। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে আছি দেখে বললেন আপনি আমেরিকাতে কী করছেন ম্যাডাম? এখানে রীতিমতো আন্দোলন চলছে লিটল ম্যাগাজিনকে ঘিরে! তাঁর উদ্দীপনা দেখে বললাম, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কবিতা পাঠিয়েছিলাম, বোধ হয় ডাক গোলযোগে পৌঁছোয়নি । হাতে হাতে দিয়ে দিলুম তিন পিস কবিতা। সেই থেকে ইউসুফের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের সূত্রপাত।
![]() |
| সম্পাদক ইউসুফ আল- খাল |
পরবর্তীতে ইউসুফ ও হেলেন গ্যালারি বন্ধ করে, রাস্তার দিকের বেসমেন্ট ভাড়া দিতে শুরু করেন বিভিন্ন শিল্প প্রদর্শনী উপলক্ষে। সিমোন, আমার এক বন্ধু আর আমি তখন মাঝে মধ্যেই ইউসুফের বাড়ি যেতুম আড্ডা দিতে। হুইস্কি ও ওয়াইন সহযোগে আড্ডা গড়াতো প্রায় মাঝরাত্রি। শেষ প্রান্তে হেলেন বলতো চলো গ্যালারির ছবিগুলো একটু দেখে আসি। আমরা ঘোরের মধ্যে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম এক একটা ক্যানভাসের দিকে।
![]() |
| ইউসুফের স্ত্রী শিল্পী হেলেন আল- খাল |
মরোক্কোতে তখন আব্দুললতিফ লাবি- র সম্পাদনায় প্রকাশিত হচ্ছে ফরাসি লিটল ম্যাগাজিন Souffles. আমি প্রথম উত্তর আফ্রিকার মরোক্কোতে যাই জুলাই, ১৯৬৬ তে। তখনও আমি রাবাত শহরে। রাস্তার ফুটপাতে খুঁজে পাই এই পত্রিকা। আরবের বিভিন্ন শহরে বইপত্র মূলত ফুটপাতেই বিক্রি হয়। মানুষ রাস্তাতেই হাঁটু গেড়ে বসে দেখতে থাকেন তাঁদের পছন্দের পত্রিকা। বিক্রি বাটরাও চলে এভাবেই। রাস্তায় বসে যখন Souffles এর কয়েকটা পাতা উলটিয়ে দেখছি মনে পড়ে গেল, বেইরুটে আমার স্কুল জীবনের শিক্ষক, ফরাসি লেখক গেব্রিয়েল বোনো-র কথা। ১৯৫৩ তেই তিনি বেইরুট ছেড়ে চলে যান কায়রো আর কিছু বছর বাদে স্থানান্তরিত হন রাবাতে। পত্রিকায় কোথাও তাঁর নাম লেখা নেই। কিন্তু কেন জানি না, কয়েক লাইন পড়েই মনে হচ্ছিল সম্পাদক নির্ঘাত গেব্রিয়েল স্যারের ছাত্র। তিনি ছিলেন কবিতার মহীরুহ, যাঁর কবিতা পাঠের পদ্ধতি কোনো ভাবেই অ্যাকাডেমিক নয়, পড়ানোর স্টাইলই ছিল আলাদা। Souffles এর প্রকাশিত কবিতাগুলো দেখতে দেখতে মনে হয়েছে ঠিক এরকমই গভীর ও উচ্চমানের কবিতা তিনি আমাদেরকে পড়াতেন। অবশ্য এটাও মনে আছে, লেবানন থেকে তাঁকে ঔপনিবেশিক ফরাসি সরকার বিতাড়িত করেছিলেন, অ্যালজেরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ফ্রেঞ্চ পলিসির সমালোচনা করবার জন্যে।
![]() |
| Souffles এর প্রচ্ছদ |
পত্রিকার ভেতরেই পেয়ে গেলাম ঠিকানা । সেই অনুযায়ী পৌঁছোলাম সম্পাদকের দোরগোড়ায়। ঘড়িতে তখন প্রায় রাত ৮ টা। দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক ফরাসি ভদ্রমহিলা। তিনি ছিলেন আব্দুল লতিফের শাশুড়ি মাতা। জানালেন, সম্পাদক তখন হাসপাতালে, কারণ সেদিনই তাঁর স্ত্রী জন্ম দেবেন তাঁদের প্রথম সন্তানের। অগত্যা, বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম। ন' টা কিংবা তার একটু পরেই হবে, ফিরে এলেন লাবি। বললাম, খুবই দুঃখিত আপনাকে আজকেই বিরক্ত করবার জন্যে। আসলে আগামীকাল আমি ফিরে যাচ্ছি, রাস্তায় আপনার পত্রিকা দেখে মনে হলো, আপনি নিশ্চয়ই গেব্রিয়েল বোনো- র ছাত্র? বললেন, ইয়েস! অফ কোর্স আই অ্যাম!
সেই সময়ে আমরা বিশ্বাস করতাম আরব ঐক্যে। আর আমাদের মতোই Souffles সম্পাদক লাবিও চেয়েছিলেন আরব যুক্তরাষ্ট্র। তাঁকে বলেছিলাম, আমরা সরকারের জন্যে অপেক্ষা করবো না, তৈরি করবো নিজেদের মতো করে এক যুক্তরাষ্ট্র। বললুম, খুব তাড়াতাড়ি আমাকে বেইরুট ফিরতে হবে, তবে সেখানে পৌঁছে আপনার Souffles নিয়ে আলোচনা করবো। পরবর্তীতে সিরিয়ান কবি আদোনিসকে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তাঁর পত্রিকায়। ভালো লাগে, কারণ আমিই তাঁদের মধ্যে তৈরি করেছিলাম সংযোগ। পরে Souffles এর জন্যে আমার Jebu শীর্ষক কবিতার একটা অংশ পাঠিয়েছিলুম। লাবির সঙ্গে আমার বন্ধুত্বে কোনোদিন চিড় ধরেনি।
![]() |
| সম্পাদক আব্দুল লতিফ লাবি |
মরোক্কোতে সেই সময়ে Souffles ভালো প্রভাব ফেলেছিল। ফ্রেঞ্চ- মরোক্কান তরুণ সম্প্রদায়ের প্রায় প্রত্যেকেই লেখালেখি করেছে এই কাগজে। এটিতে রাজনীতিও ছিল পুরো দমে। ফলে সেই সময়ের তরুণ সম্প্রদায় সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে বলেই আমি মনে করি। আমার অন্যতম প্রিয় উত্তর আফ্রিকান কবি মোস্তাফা নিসাবোরি ও তাহার বেন জালুনের কবিতাও প্রকাশিত হয়েছে Souffles এ।
পরবর্তীতে আব্দুল লতিফ লাবি যখন জেলে, আমরা একে অপরকে বহু চিঠি লিখেছি। তাঁর স্ত্রী একবার আমাকে চিঠিতে লেখেন, এঞ্জেলস এর সমগ্র দিয়ে এসেছেন জেলে, লাবি পড়বেন বলে। আমার কাছে দর্শনের বই খুবই কঠিন বলে মনে হয় তাই লাবি কে একবার পাঠিয়েছিলুম রং পেন্সিল আর আঁকার খাতা। লাবি সব সময় বলে, আমাদের বন্ধুত্বের বয়স ঠিক ততটাই যতটা বয়স হবে আমার প্রথম কন্যার।







Comments
Post a Comment