।। মাওরি ভাষার সংবাদ সাময়িকী ও লিটল ম্যাগাজিন।।



সুশোভন রায়চৌধুরী

নিউ জিল্যান্ডের আদিবাসী সম্প্রদায় বলতে বোঝানো হয় ' মাওরি ' জনজাতিকে। এঁরা নিউ জিল্যান্ডে আসেন গ্রীসের পলিনেশিয়া অঞ্চল থেকে তেরো-চোদ্দো শতকেই। তখন থেকে নিউ জিল্যান্ডের একমাত্র ভাষা হয়ে উঠেছিল 'মাওরি' ই যতক্ষণ না আঠারো শতকে ইয়োরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের প্রবেশ ঘটে এই দেশে। বর্তমানে নিউ জিল্যান্ডে ইংরেজির আধিপত্যে ' মাওরি ' সম্পূর্ণ বিলুপ্ত না হলেও তাঁরা যে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন তা অস্বীকার করবার কোনো উপায় নেই। নিউ জিল্যান্ডের ইতিহাস, প্রাগাধুনিক সাহিত্য, সমাজ- সংস্কৃতি সম্পর্কে ন্যূনতম ধারনাও যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে 'মাওরি ' ভাষায় প্রকাশিত সরকারি ও বেসরকারি পত্র- পত্রিকা এবং সংবাদপত্র সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে, বুঝতে হবে মাওরি প্রকাশনার টোন, টেম্পারামেন্ট ও কনটেন্টকে।

জনৈক মাওরি পুরুষ
 প্রথমেই আসা যাক, নিউ জিল্যান্ডের মাটিতে মাওরি সংবাদপত্রের     ভূমিকা প্রসঙ্গে। ১৮৪২ সালে সরকার প্রকাশ করেছিল মাওরি ভাষার   প্রথম সংবাদপত্র ' কো তো কারেরে ও নুই তিরেনি '। তখন থেকে   ১৯৩০ পর্যন্ত প্রায় ৪০ টি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে যার কিছু   সরকার, কিছু ধর্মীয় সংগঠন ও কিছু ব্যক্তি উদ্যোগে আত্মপ্রকাশ   করে। এদের মধ্যে কিছুর সার্কুলেশন যেমন দেশ ব্যাপী ছিল, কিছু   আবার ছিল আঞ্চলিক গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ। সাপ্তাহিক, পাক্ষিক অথবা   মাসিক হিসেবে প্রকাশিত হতো এই সংবাদপত্রগুলি। মাওরি ভাষার   বেশির ভাগ সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার মূল কারণই হলো   অর্থনৈতিক অভাব। বিশ শতকে এসে নিউ জিল্যান্ডের মাটিতে মাওরি সংবাদপত্র প্রায় নেই বললেই চলে যার মুখ্য কারণ দেশের রাজভাষা   হিসেবে ইংরেজিকে গ্রহণের ফলে, কমে গিয়েছে মাওরি ভাষার   প্রাসঙ্গিকতা।





মাওরি ভাষার কাগজগুলো প্রধাণত তাঁদের জনজাতির আশা - আকাঙখা, চাহিদা ও চিন্তা ভাবনাকে তুলে ধরবার জন্যেই প্রকাশ পেয়েছিল।
জনৈক মাওরি নারী
যদিও সম্পাদকীয়, চিঠিপত্র বা আর্টিকেলগুলিকে খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, তাঁদের নজর আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খবরের প্রতি সমান ভাবেই ছিল। মাওরিরা ইয়োরোপীয় বংশদ্ভূতদের ' পাকেহা ' সম্বোধন ' করতেন। তাঁদের নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতির ওপর ইয়োরোপীয় ঔপনিবেশিক আধিপত্য বিস্তারের ফলে ' পাকেহা'দের প্রতি তাঁরা কিছুটা হলেও বিরূপ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বর্ণবিদ্বেষ মূলক মন্তব্য ও সমস্যা হয়ে উঠেছিল দৈনন্দিন সংবাদের অঙ্গ। দুই জাতির এই বিবাদ মেটাতে বসতো সভা, যে সভা কেন্দ্রিক খবর প্রকাশ পেত সংবাদপত্রগুলিতে। উঠে আসতো সরকার, যুদ্ধ, ধর্ম, শিক্ষা ও সামাজিক জীবন সম্পর্কে 'মাওরি' দের চিন্তাভাবনা।

এই সময়ের সংবাদপত্র যে ভাষায় লেখা হতো, তা আঠারো শতকের লিখিত মাওরি থেকে কিছুটা হলেও আলাদা। সংবাদপত্রের ভাষা ছিল তাঁদের পরিবর্তনশীল কথ্য ভাষার রূপ, যেখানে কথ্য, পদ্য ছন্দের ভাব ফুটে ওঠে। কাগজগুলির আর একটি বৈশিষ্ট হলো, তাঁরা এগুলির নামকরণ কোনো না কোনো পাখির নামে করতেন। যেমন ' হোকিওয়ি ' ( Giant Bird) , পিহোইহোই' ( Pipit) , 'কোরিমাকো' ( Bell Bird), ' পিপিহোয়ারাউরোয়া ' ( Shining Cuckoo) ইত্যাদি। মজার বিষয়, অর্থনৈতিক অনটনে যদি কোনো সম্পাদক পাঠকের উদ্দেশে সাহায্য পাঠানোর বিজ্ঞপ্তি ছাপাতেন, সেই বিজ্ঞপ্তিতে টাকার পরিবর্তে লেখা হতো " Seeds for our bird "!

মাওরি ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে সংবাদপত্রগুলির ভূমিকা অপরিসীম। নতুন শব্দ সৃষ্টি থেকে শুরু করে নিত্য নতুন পণ্যের বিজ্ঞাপনের ভাষা, ইংরেজি থেকে মাওরি অনুবাদ, সবই পাওয়া যাবে। এদের মধ্যে কিছু পত্রিকা ছিল দ্বিভাষিক যেখানে পাকেহারা ( ইয়োরোপীয়রা) নিজেরাই মাওরি ভাষায় তাঁদের চিঠিপত্র পাঠাতেন। এককথায়, দুটি ভিন্নভাষী জাতির সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক আদান প্রদানের এক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছিল এই সংবাদপত্রগুলি। পাওয়া যেত মাওরি ঐতিহ্য অনুসারে যে কোনো চিঠির শেষে প্রাপকের প্রতি উৎসর্গীত প্রেরকের লেখা লোক গান।


প্রথম দিকে, অর্থাৎ ১৮৪২ থেকে ১৮৭৭ এর মধ্যে যে সমস্ত সংবাদপত্র সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত হয়েছিল, তাদের উদ্দেশ্য ঘুরে ফিরে ছিল একটাই --- ' পাকেহা ' সরকারের আইনকানুন সম্পর্কে মাওরি জন জাতিকে অবগত করা। সংবাদপত্রের টোন বা টেম্পারামেন্টে ছিল প্রভুত্বের ছাপ, একটা নির্দেশনার ভঙ্গি। উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে --- ' The Maori Messenger - ko te karere Maori ' ( ১৮৪৯ -৫৪) যেখানে সম্পাদকের দায়িত্ব সামলাতেন সরকারি আধিকারিকেরাই। এই প্রভুত্বের টোন বর্জন করে কিছুটা মধ্যস্থতায় মাওরি ও পাকেহাদের একে অপরের সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা দেখা যায় ' তে ওয়াকা মাওরি ও আহুরির' ( ১৮৬৩-৭১) পত্রিকায়। তবে দুর্ভাগ্যবশত এই পত্রিকা ও তার উত্তরসূরি ' তে ওয়াকা মাওরি ও নিউ তিরানি '(১৮৭১-৭৭)কে দেখে যেতে হয়েছে মাওরি বনাম পাকেহা সরকার ও মাওরি বনাম মাওরিতে ভাগ হয়ে যাওয়া দলের গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব। এটি সেই সময়ের ঘটনা, যখন নিউ জিল্যান্ডের পূর্ব তীরবর্তী অঞ্চল এবং তারানাকি ও ওয়াইকাতো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে গোষ্ঠী

দ্বন্দ্বের আগুন। এই সময়ে সংবাদপত্রে প্রকাশ পেতে দেখা গিয়েছে অশান্তি সহ্য করতে না পেরে মাওরি পরিবারের দেওয়া জমি বিক্রির বিজ্ঞপ্তি, মাওরি জনজাতির ওপর নিউ জিল্যান্ড কোর্টের এক্তিয়ার, সংসদে মাওরি প্রতিনিধির জন্যে সংরক্ষণের দাবি ইত্যাদি বিষয়। এছাড়াও এই সমস্ত সংবাদপত্র হয়ে উঠেছে সেই সময়ের ছোটো ছোটো গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে যাওয়া মাওরি জনজাতির প্রধান বা মোড়লদের ইয়োরোপীয় কলোনাইজেশন সম্পর্কিত ভাবনার প্রামাণ্য দলিল। যেমন ১৮৪৪ এ ' কো তে কারেরে ও নুই তিরেনি ' তে প্রকাশ পেতে দেখা যায় তৎকালীন গভার্নর রবার্ট ফিটজরয়কে লেখা মাওরি প্রধানের চিঠি। চিঠিটিতে ছিল আলাদা পাঁচটি বসতির সর্দারদের সাক্ষর, প্রসঙ্গ মাওরি জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলের জমি বিক্রি সংক্রান্ত আইনের আলোচনা। সেই সময়ে নিউ জিল্যান্ডে ইয়োরোপীয় সরকারের অনৈতিক জমি বিক্রির পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে হয়েছে আন্দোলন যার বিস্তারিত বিবরণ অত্যন্ত কড়া ভাষাতেই প্রকাশিত হয়েছিল সাময়িকীগুলিতে। এক্ষেত্রে মাওরিদের লেখনিতেও পাওয়া যাচ্ছে আক্রমণাত্মক, নির্দেশনার ভঙ্গি।


উনিশ শতকে খ্রীষ্ট ধর্মের প্রচারের জন্যেই পাদ্রিরা এসেছিলেন নিউ জিল্যান্ড। তাঁদের ধর্ম প্রচারের সুবিধে ও মাওরি রাজনীতির সামনে নিজেদের জন্যে একটা শক্ত ভিত গড়ে তুলতে প্রকাশ করতে শুরু করেন সংবাদপত্র। যেমন পাদ্রি চার্লস ডেভিস একাই সম্পাদনা করতেন তিন তিনটে সাময়িকীর। 'তে ওয়াকা ও তে ইউই ' (১৮৫৭) , ' তে হোয়েতু ও তে তাউ ' ( ১৮৫৮) এবং ' তে আওতিয়ারোয়া ' বা ' দ্য মাওরি রেকর্ডার ' (১৮৬১-৬২)। পাদ্রি ডেভিস তাঁর সংবাদপত্রের মাধ্যমে মাওরি ভাষার একটা প্রেস খোলবার ইচ্ছে প্রকাশ করেন যা মাওরিরা খুবই সদর্থক ভাবেই গ্রহণ করেছিলেন।

পাদ্রি ওয়ালটার বুলার তাঁর সম্পাদিত কাগজ ' তে পারেরে ও পোনেকে ' ( ১৮৫৭-৫৮) এর মাধ্যমে যেমন ধর্মীয় উপদেশ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন মাওরিদের, একই সঙ্গে মাওরি ভাষী মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন তাঁদের জনজীবন সম্পর্কে তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় লিখতে। যার ফলে দেখা যাবে অনেক ক্ষেত্রেই মাওরি লেখকেরা তাঁদের কৃষ্টি, ধর্মীয় আচার আচরণকে ছেড়ে না দিয়ে খ্রীষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, প্রশ্ন করেছেন বারংবার। উল্লেখ্য সম্পাদক হিসেবে ওয়ালটার বুলার তাঁর মতাদর্শের পক্ষে এবং বিপক্ষে লেখা প্রতিটি লেখাই সমান গুরুত্বে প্রকাশ করেছেন তাঁর সাময়িকীর পাতায়।

এই ধর্ম নিয়ন্ত্রিত কাগজে পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞপ্তি ও বিজ্ঞাপন। উঠে আসে উনিশ শতকের নিউ জিল্যান্ডের এক প্রাঞ্জল ছবি। যেমন 'তে কোরিমাকো ' পত্রিকায় দেখা যায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো পশু সম্পর্কিত বিজ্ঞপ্তি, পৈতৃক জমিতে বেড়া দেওয়ার আইন সম্পর্কিত নোটিস, কুকুর পোষার ওপর ট্যাক্স তুলে দেওয়ার জন্যে মাকেতু কমিটির রিপোর্ট। বিজ্ঞাপনদাতাদের মধ্যে চোখে পড়ে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও মাওরি জনজাতিরই কিছু মানুষের বক্তব্য যাঁরা খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণে সম্মতি জানিয়েছিলেন। উদাহরণ, ' তে কোরিমাকো ' তে প্রকাশিত মাওরি বংশদ্ভূত রাউরেতি মোকোনইয়ারাঙ্গির দেওয়া একটি বিজ্ঞপ্তি যেখানে তিনি এই পত্রিকারই পুরোনো সংখ্যাগুলিকে বিক্রির জন্যে অনুরোধ জানাচ্ছেন ( " Bound like the Bible ") বাইবেলের মতো বাঁধিয়ে। আবার অপর এক ইয়োরোপীয় বংশদ্ভূত জন হোয়াইট বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মাওরিদেরকে আহ্বান জানাচ্ছেন, এই পত্রিকায় তাঁদের জন জীবন সম্পর্কিত প্রবন্ধ লিখতে যার পরিবর্তে প্রতি ৩০০ পাতার পাণ্ডুলিপি পিছু ৫ ডলার করে তিনি নিজেই দিতে রাজি!

'তে কোরিমাকো' র ( ১৮৮২-৮৮) সম্পাদক ছিলেন পাদ্রি ডাব্লিউ পি স্নো, যিনি এই সংবাদ সাময়িকীটিকে করে তুলতে চেয়েছিলেন হিতোপোদেশমূলক। পত্রিকায়, মাওরি মানুষ কী বিশ্বাস করবেন আর কী বিশ্বাস করা উচিত নয়, তাঁদের ব্যবহার কীরকম হওয়া উচিত, কীভাবে থাকবেন, কী কাজ করবেন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বহু লেখাই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও স্থান পেয়েছে আঞ্চলিক, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক খবর। প্রকাশিত হয়েছে মাওরি জন জাতির কোনো মানুষের প্র‍য়াণে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মাওরি ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্র থেকে পাওয়া যায় নিউ জিল্যান্ডের গির্জার ইতিহাস সম্পর্কিত বহু তথ্য। কোনো গির্জার পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত নিউ জিল্যান্ডের প্রথম সংবাদপত্রটি হলো ' Wesleyan Te Haeata ' ( ১৮৫৯-৬২), সম্পাদক রেভারেন্ড থমাস বাডল। এই পত্রিকার ভাষায় মাওরি প্রবাদ ও metaphor এর ব্যবহার নজর কাড়ে। যদিও পত্রিকাটির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল মাওরিদের নিজস্ব ধর্ম ভাবনা থেকে সরিয়ে এনে খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বী করে তোলা। প্রকাশিত হয়েছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ক খবর, ইয়োরোপীয় রাজাদের কাজকর্ম, যুদ্ধ ও নিউ জিল্যান্ডের তারানাকি এবং ওয়াইকাতো অঞ্চলের মাওরি সম্প্রদায়ের গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব বিষয়ক প্রতিবেদন।

সেই সময়ে সাময়িকী প্রকাশের ক্ষেত্রে নিউ জিল্যান্ডের পূর্ব তীরবর্তী 'চার্চ অফ ইংল্যান্ড ' গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাঁরা প্রকাশ করেছেন একাধিক কাগজ ' হে কুপু হোয়াকামারামা ' (১৮৯৯), ' তে পিপিহোয়ারাউরোয়া ' ( ১৮৯৯-১৯১৩), ' তে কোপারা ' ( ১৯১৩-২১), ' তে তোয়া তাকতিনি ' ( ১৯২১-৩২)। এই পত্রিকাগুলির সম্পাদক হিসেবে দেখা যাচ্ছে মাওরি সম্প্রদায়ের বর্ষীয়ান মানুষ কিংবা নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিত্বদের। গির্জার মুখপত্র হওয়ার কারণে যেমন সাংগঠনিক সংবাদ প্রকাশ পেয়েছে একই সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে ধর্মীয় ও মাওরি ভাষা শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ। ধর্ম, শিক্ষা, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক খবরকে তাঁরা উপস্থাপন করেছিলেন, মাওরি সংস্কৃতির আদলেই। লোক গান, নৃতত্ত্ব, ট্রাইবাল ইতিহাস ও প্রবাদ হয়ে উঠেছে মুখ্য হাতিয়ার। 'চার্চ অফ ইংল্যান্ডের ' তত্ত্বাবধানের বাইরেও প্রকাশিত হয়েছে রাতানা গির্জার পৃষ্ঠপোষকতায় ' তে হোয়েতু মারামা ও তে কোতাহিতাঙ্গা ' (১৯২৪) এবং প্রেসবাইটেরিয়ান গির্জার মুখপত্র রূপে প্রকাশ পেতে দেখা যায় ' ওয়াকা কারাইতিয়ানা ' ( ১৯৩৩-৯৬) পত্রিকাটিকে।

নিউ জিল্যান্ডের মাওরি ভাষার সংবাদ সাময়িকী চর্চার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ নিঃসন্দেহে মাওরি সম্প্রদায়ের ব্যক্তি উদ্যোগে প্রকাশিত পত্রিকাগুলি। সরকারি ও ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিক পত্রিকায় অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি বিভিন্ন চিঠির মাধ্যমে মাওরি মানুষেরা সরকারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন কাজ করবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন, বিরোধীতা করেছেন বহু সরকারি নিয়ম নীতিরও। যেহেতু ব্যক্তি কেন্দ্রিক পত্রিকায় ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীনতা তাই এগুলিকেই বলা যেতে পারে মাওরিদের স্বতঃস্ফূর্ত আওয়াজ। ব্যক্তি কেন্দ্রিক কাগজগুলো খুব স্বাভাবিক ভাবেই শুরু হতো কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে কেন্দ্র করে, উদ্দেশ্য তাঁদের দাবি-দাওয়া পৌঁছোক 'পাকেহা ' সরকারের কানে। ব্যক্তি উদ্যোগে প্রকাশিত মাওরি ভাষার প্রথম সংবাদ সাময়িকী ' তে হোকিওই ও নিউ তিরেনি এ রেরে আতু না ' যার আত্মপ্রকাশ জানুয়ারি-মে ১৮৬৩, হয়ে উঠেছিল কিঙ্গিতাঙ্গ অঞ্চলের মাওরি আন্দোলনের মুখ। আত্মপ্রকাশ সংখ্যার সম্পাদকীয় থেকেই পরিষ্কার, তাঁরা তাঁদের বক্তব্যকে ছড়িয়ে দিতে চান সারা বিশ্বে। ওয়ামেরু পাতারা তে তুহি সম্পাদিত এই কাগজ প্রকাশিত হতো গারুয়াওয়াহিয়া অঞ্চল থেকে। ছাপা হতো এমন একটি প্রেস থেকে যা ওয়াইকাতো অঞ্চলের দুই মাওরি প্রধানকে উপহার দিয়েছিলেন অস্ট্রিয়ার রাজা, যখন তাঁরা ১৮৫৯ সালে ভিয়েনাতে বেড়াতে যান। ওই কাগজে উঠে এসেছে ঔপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ, যে প্রতিবাদ শুধুমাত্র মাওরি সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁদের সঙ্গে সহমত হয়ে সামিল হয়েছিলেন ইয়োরোপীয় বংশদ্ভূত সরকারি আধিকারিকেরাও। সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করতে তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট জন গর্স্টের সম্পাদনায়, তে আওয়ামুতু অঞ্চল থেকে প্রকাশিত হয় ' তে পিহোইহোই মোকেমোকে ই রঙ্গা ই তে তাউনুই ' পত্রিকা ( ফেব্রুয়ারি-মার্চ, ১৮৬৩)। ব্যক্তি উদ্যোগে প্রকাশিত সংবাদপত্রে সরকারবিরোধী লেখা বন্ধ হয় মার্চ, ১৮৬৩ তে যখন গাতি মানিয়াপোতা অঞ্চলের মাওরি বসতির প্রধান গঠন করেন এক রাজনৈতিক দল যারা অধিগ্রহণ করে নেয় সমস্ত সরকারি প্রেসগুলোকেই।

তে কোরিমাকো-তে প্রকাশিত বিজ্ঞাপন
 এই মাওরিদের মধ্যেও রয়েছে বিভিন্ন উপজাতি যাঁরা সমগ্র   নিউ জিল্যান্ড ব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন। ইয়োরোপীয়   উপনিবেশের বিরুদ্ধে মাওরিদের রাজনৈতিক শক্তি ক্রমশই   বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তাঁরা উপলব্ধি করলেন, প্রতিটি উপজাতির   এবার একজোট হয়ে লড়বার সময় এসেছে। সমস্ত   উপজাতিকে এক জোট করবার লক্ষ্যে প্রকাশিত হলো হেনারে   তোমোয়ানা এবং কারাইতিয়ানা তাকামোয়ানা সম্পাদিত   পত্রিকা ' তে ওয়ানাঙ্গা ' ( ১৮৭৪-৭৮) যার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে   দেখা যায় ইয়োরোপীয় বংশদ্ভূত অঁরি রাসেলকে। প্রথম   সম্পাদকীয়তেই তাঁদের ভাবনা ও বার্তাটিকে স্পষ্ট করে তুলে   ধরলেন সম্পাদকদ্বয়। পত্রিকার পাতায় ছাপতে শুরু হয়   আঞ্চলিক স্তরে হেনারে মাতুয়ার নেতৃত্বে সংগঠিত, সরকার ও   ইয়োরোপীয়দের কাছে জমি বক্রির বিরুদ্ধে আন্দোলনের পুঙখানুপুঙখ খবর। হেনারে মাতুয়া সরব হয়েছিলেন ' মাওরি স্বরাজ' এর পক্ষে। এই সময়ে ক্রমেই সংসদে বৃদ্ধি পাচ্ছে মাওরি প্রতিনিধির সংখ্যা, তাঁরা জিতছেন একের পর এক নির্বাচন। ফলে ' তে ওয়ানাঙ্গা ' এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত ' তে ওয়াকা মাওরি ও নিউ তিরানি ' গোষ্ঠীর মধ্যে বাধে সংঘাত ও বিতর্ক, যে বিতর্ক প্রকাশিত হয়েছে দুই সাময়িকীর পাতাতেই। ' তে ওয়ানাঙ্গা ' তে রাজনৈতিক খবরের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে চিঠিপত্র, প্র‍য়াণলেখ, বিয়ে, নতুন প্রেক্ষাগৃহের উদ্বোধন, খেলাধুলো ও ঘোড় দৌড়ের মতো বিষয়।


মাওরি পরিবার

মাওরি ভাষার বেশিরভাগ সংবাদ সাময়িকীর সম্পাদক হিসেবে পুরুষদের দেখা গেলেও, ' তে পুকে কি হিকুরাঙ্গি 'পত্রিকার যৌথ সম্পাদক ছিলেন নারী, গাতি কাহুনগুনু ও রাঙ্গিতানে যাঁরা সম্পাদনার পাশাপাশি বহু ইংরেজি আর্টিকেল মাওরি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। ১৮৯৭ তে আত্মপ্রকাশ করা নারী সম্পাদিত এই কাগজ অনিয়মিত ভাবে চলেছিল ১৯১৩ পর্যন্ত। এটিই ছিল মাওরি সাংবাদিকতার স্বর্ণযুগের শেষ প্রতিনিধি। পরবর্তীতে এই সংবাদ সাময়িকীর ধারাটি বিলুপ্তির পথে হাঁটতে শুরু করে।.


মাওরি সাহিত্য পত্রিকা বা লিটল ম্যাগাজিনের শুরু ১৯৫০ এর দশকে। যেহেতু বিশ শতকের প্রথমার্ধব্যাপী মাওরি ভাষা ক্রমশ ইয়োরোপীয় অনুপ্রবেশের কারণে ধাক্কা খাচ্ছিল ও জন সংখ্যার নিরিখে ভূমিপুত্র মাওরিরাই হয়ে পড়ছিলেন সংখ্যালঘু তাই ১৯৫০ এর দশকে মাওরি কেন্দ্রিক সাহিত্য পত্রিকা বা লিটল ম্যাগাজিনে ইংরেজির আধিক্যই বেশি চোখে পড়ে। যদিও ইংরেজির পাশাপাশি দ্বিভাষিক পত্রিকাও প্রকাশিত হয়েছে। খুব সামান্য সংখ্যক পত্রিকাই ছিল, যা সম্পূর্ণ মাওরি ভাষাতেই প্রকাশিত। এই পত্রিকাগুলি থেকে উঠে আসে আধুনিক মাওরি জীবনের প্রতিফলন।


মাওরি ভাষার প্রথম সাহিত্য পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালে, নিউ জিল্যান্ড সরকারের মাওরি উন্নয়ন দপ্তরের পৃষ্ঠপোষকতায়। প্রথম যখন পত্রিকাটি প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, সরকার চেয়েছিল এটির মাধ্যমেই তাঁরা প্রচার করবেন মাওরিদের উন্নয়ন সম্পর্কিত প্রকল্পের কথা। কিন্তু বাধ সাধেন পত্রিকার পরিচালন সমিতি, তাঁদের দাবি এটিকে করে তুলতে হবে একটি নিখাদ সাহিত্য পত্রিকা। আত্মপ্রকাশ সংখ্যাটি প্রকাশ পেতে দেখা গেল পত্রিকা পরিচালন সমিতি তাঁদের ইচ্ছেটাকেই বজায় রেখেছেন। ' তে আও হোউ ' হয়ে উঠেছে মাওরি গবেষণা ও মাওরি সাহিত্য কেন্দ্রিক পত্রিকাই। পত্রিকাটি চলেছিল ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। মাওরি ও পাকেহা স্কলারদের বহু গুরুত্বপূর্ণ লেখাই স্থান পেয়েছে এই পত্রিকার পাতায় যদিও কোনোদিনই কোনো মাওরি সম্প্রদায়ের মানুষকে এটির সম্পাদনার দায়িত্বে দেখা যায়নি। ইয়োরোপীয় বংশদ্ভূত সম্পাদকেরা মাওরি ভাষা ও তার মানুষদেরকে ভালোবেসে পত্রিকা সম্পাদনার ক্ষেত্রে যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে স্মরণে রাখবার মতোই। মাওরি ভাষার মৌখিক লোক -উপাদান ও উপন্যাস হয়ে উঠেছিল এই পত্রিকার অন্যতম আকর্ষনীয় বিষয়। প্রতিটি লেখার সঙ্গে থাকত সাযুজ্যপূর্ণ অলংকরণ, বেশির ভাগই লাইন ড্র‍য়িং-এ। থাকত, মাওরি জনজাতির ফোটো গ্যালারি।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত আরও দুটি পত্রিকা --- ' তে কাইয়া ' (১৯৬৯-৭১) এবং ' তু তাঙ্গাতা 'য়(১৯৮১-৮৭) সাহিত্যের পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিবেদন। থাকত বই আলোচনা, কবিতা, গল্প এবং মাওরি ভাষা ও শিল্প কেন্দ্রিক সমীক্ষার রিপোর্ট। সাম্প্রতিক কালে মাওরি উন্নয়ন দপ্তর প্রকাশিত ' কোকিরি পাতে ' (১৯৯৬-২০০৭) পত্রিকাটি ছিল সচিত্র যদিও তার কনটেন্টে পপুলার সাহিত্যের কিছুটা ছোঁয়া পাওয়া যায়। সরকারি উদ্যোগে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো দীর্ঘমেয়াদী হয়ে ওঠেনি। ব্যতিক্রম -- "তে ওয়ার হুইরি ই তে রিও মাওরি রা " বা মাওরি ভাষা কমিশনের উদ্যোগে প্রকাশিত ' হে মুকা '। আত্মপ্রকাশ ১৯৯৮ এবং এখনো পর্যন্ত নিয়মিত ভাবেই প্রকাশিত হয়ে চলেছে।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় যে পত্রিকাগুলি সম্পর্কে আমরা জানছি তাদের টার্গেট রিডার সব সময়ে মাওরি জন জাতিই ছিল। এগুলিকে সর্বজনীন পাঠকের জন্যে প্রকাশ না করবার কারণ হিসেবে আমরা 'তে কাইয়া ' সম্পাদক কারা পুকেতাপু ও 'মানা ' সম্পাদক ডেরেক ফক্সের উক্তি দেখে নিতে পারি। তাঁদের মতে নিউ জিল্যান্ডের জনসাধারণকে উদ্দেশ্য করে প্রকাশিত যাবতীয় পত্রিকায় মাওরিভাষীদের সঠিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি।


এবার দেখে নেওয়া যাক এমন কিছু পত্রপত্রিকা, যা প্রকাশিত হয়েছে মাওরি অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে, মাওরি মানুষের সম্পাদনাতেই। এই পত্রিকাগুলিকে না সাহিত্য না সংবাদ -সাময়িকী কোনো নির্দিষ্ট বিভাগের অন্তর্ভুক্ত করা মুশকিল। সেখানে যেমন সাহিত্য থাকে, থাকে মাওরি জনজীবন সম্পর্কিত প্রতিবেদন, তাঁদের রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া। অর্থনৈতিক অনটনে, অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর ও প্রকৃত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত অঞ্চলের এই সমস্ত পত্রিকা যেমন আকারে ছোটো, তেমনই অর্থনৈতিক অভাবের ছাপ ফুটে ওঠে প্রকাশনার মানেও।

এই ধরনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা হলো গাতি মানিয়াপোতা থেকে প্রকাশিত ' কিওয়া হিওয়া রা ' (১৯৯১-৯৮), 'কাহানগুনু '(১৯৯১-৯৫), মাতাতুয়া থেকে প্রকাশিত 'পু কাইয়া ' ( ১৯৯২-৯৫ ;২০০৬---), পূর্বতীরবর্তি অঞ্চল থেকে প্রকাশিত ' তুরাঙ্গানুই আ কিওয়া পিপিহোয়ারাউরোয়া '(১৯৯৪-৯৭),গাই তাহু সম্পাদিত 'তে কারাকা ' (১৯৯৫---)।
এই সমস্ত পত্রিকাগুলিতে স্থান পাচ্ছে স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, শিক্ষা, ব্যবসা, কৃষি ও মাছ চাষের মতো বিষয়। থাকে মাওরি শিল্প ও ভাষা কেন্দ্রিক প্রবন্ধও। প্রকাশিত হয়েছে মাওরি ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, লোক গান, জীবনীমূলক গদ্য এবং মাওরি প্রধানদের আত্মজীবনী। প্রতিটি পত্রিকাই সচিত্র।

বর্তমানে নিউ জিল্যান্ডের মোট জন সংখ্যার প্রতি ৭ জনের মধ্যে ১জন মাওরি। সরকারি বা রাজভাষা ইংরেজি হয়ে থাকার কারণে তাঁদের মাতৃভাষা মাওরি যে বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে বলে তাঁদের আশঙ্কা তা একেবারে অমূলক নয়। নিভন্ত প্রদীপের আলো বলতে, নিউ জিল্যান্ডের ন্যাশনাল লাইব্রেরি ঘোষণা করেছে, তাঁরা প্রায় ১৪০ টি মাওরি পত্র-পত্রিকার সংখ্যা ডিজিটাইজ করে উন্মুক্ত করতে চলেছেন সারা বিশ্বের কাছে। উনিশ শতকে বিশ্ববাসীর কাছে তাঁদের আওয়াজ পৌঁছে দেওয়ার যে স্বপ্ন মাওরি সম্পাদকেরা দেখেছিলেন, সেই স্বপ্নেরই এক রূপায়ণ ঘটতে চলেছে খুব তাড়াতাড়ি।

Comments