|| গথাম বুক মার্ট ||


সুশোভন রায়চৌধুরী


১ জানুয়ারি, ১৯২০। ম্যানহাটনের ওয়েস্ট ৪৫ স্ট্রিটের একটি বেসমেন্ট এর সামনে এসে দাঁড়ালো এক ঘোড়ায় টানা গাড়ি। গাড়িতে রয়েছে ১৭৫ টি বই। পাশে ৩২ বছর বয়সী এক তরুণী যিনি বই সংগ্রহ ও নির্বাচনের পদ্ধতি শিখে এসেছেন চার্লস পি. এভারিটের কাছে, এভারিটের বইয়ের দোকান ' ব্রেনটানোর ' এক সামান্য কর্মচারী হিসেবেই। দিনটা ছিল তরুণীর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুরু করতে চলেছেন তাঁর নিজস্ব বইয়ের দোকান। দোকানের নাম রাখলেন 'গথাম বুক অ্যান্ড আর্ট' যা পরে হয়ে যায় ' গথাম বুক মার্ট '। সেদিন কি তিনি ভেবেছিলেন, তাঁর দোকানটি আদৌ সফল হবে কিনা? জানি না, তবে আজ তিনি এবং তাঁর দোকান স্থান পেয়েছে ইতিহাসের পাতায়, একে অপরের পরিপূরক হিসেবে।


এতক্ষণে সবাই বুঝতেই পেরেছেন, আমরা বলছি ফ্রান্সেস স্টেলাফের কথা। যিনি ঠিক দোকান নয়, গড়ে তুলেছিলেন আভাঁ গার্দের প্রদর্শশালা। ১৯৬৭ তে তাঁর দোকান আদ্রিয়াস ব্রাউনের কাছে বিক্রি করে দিলেও এই বাড়িতেই তিনি কাটিয়েছেন সারাটা জীবন --- জীবন ১০১ বছরের।


১৯৬৫ সালে স্টেলাফের জীবনী লেখেন ডাব্লিউ জি. রজার্স। তিনি লেখেন, " Frances Steloff made the Gotham Book Mart. Then it turned around and made her. You couldn't have one without the other. " প্যারিসের সিলভিয়া বিচ কিংবা আদ্রিয়েন মনিয়ারের মতোই, স্টেলফ বেছে নিয়েছিলেন বই বিক্রির ক্ষেত্রে তাঁর স্পেশালাইজেশন। ঠিক করেন, তিনি বিক্রি করবেন শুধুমাত্র চিত্রকলা ও থিয়েটার বিষয়ক বই।
ফ্রান্সেস স্টেলফ




নতুন কেউ পেশায় যুক্ত হলেই পুরোনো পেশাদারদের উপদেশ দেওয়ার একটি স্বঘোষিত ক্ষেত্র তৈরী হয়ে যায় বোধহয়! এরকমই একজন বই বিক্রেতা স্টেলাফকে জানালেন, ' অভিনেতারা বই পড়েন না '! আর ' বইয়ের দোকান কি থিয়েটার পাড়ায় চলে! ' এই অযাচিত পরামর্শের পুরোটাই যে ভুল তা প্রমাণিত হয়েছিল যখন গথাম বুক মার্ট স্থানান্তরিত হয় থিয়েটার পাড়াতেই -- ওয়েস্ট ৪৭ স্ট্রিটে। তবে ফ্রান্সেস স্টেলাফের ইউএসপি বলতে গেলে নিঃসন্দেহে অল্প পঠিত লেখক কে পাঠকের সামনে তুলে ধরা। তিনি তাঁর দোকানকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মনে করেন নি। সুদের কারবারিদের থেকে টাকা ধার নিয়ে দিয়েছেন জন ডস প্যাসোসের মতো নবাগত ও উঠতি লেখককে তাঁর সংসার ও লেখালেখির খরচ চালানোর জন্যে। তাঁকে লড়তে দেখা গিয়েছে ফরাসি সাহিত্যিক অঁদ্রে জিদের স্মৃতিকথার হয়ে, ম্যানহাটনের তথাকথিত বিদগ্ধ মহলের নাক সিঁটকোনোর বিরুদ্ধে। তাঁর দোকানেই চাকরি দিয়েছেন অর্থাভাবে পড়া তরুণ অ্যালেন গিনজবার্গকে।
গথাম বুক মার্টের ভেতর ফ্রান্সিস স্টেলফ




ফ্রান্সেস স্টেলাফের কাজ, তাঁর দোকান, বইয়ের প্রতি তাঁর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁর জীবন ও সংগ্রহকে করে তুলেছে আলোচনা ও প্রদর্শনীর বিষয়। যে বিষয় কখনো হয়ে উঠেছে ' বিশ শতকের বই বিক্রি, ' আন্তর্জাতিক বই বাজারের নারী বিক্রেতা ', আবার কখনও বা ' লিটল ম্যাগাজিনে মডার্নিজমের উত্থান : এক প্রাকৃত সংগ্রাহক ' । হবে নাই বা কেন? যে দোকানের ক্রেতার তালিকায় থাকে চার্লি চ্যাপলিন, এডওয়ার্ড অ্যালবি, ডিক ক্যাভেট কিংবা মার্থা গ্রাহামের মতো বহু কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব ও সাহিত্যিক, যে দোকান বই বিক্রির পাশাপাশি আয়োজন করে দুষ্প্রাপ্য লিটল ম্যাগাজিন, পোতি হ্রভু, রিভিস্তা, জাসশি কিংবা এফিমেরার প্রদর্শনী, যে দোকান থেকে স্টকহোমের নোবেল কমিটি সংগ্রহ করেন সাহিত্যে নোবেল দেওয়ার আগে মনোনীত বই, তাকে নিয়ে আলোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক, হওয়া প্রয়োজনও।


গথাম বুক মার্টের সংগ্রহ থেকে একটি লিটল ম্যাগাজিন

ফ্রান্সেস স্টেলাফের জীবনাবসান হয় ১৯৮৯ তে। বিশ্বের অন্যতম সেরা বইয়ের দোকান ' গথাম বুক মার্ট ' চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় ২০০৮ সালে। দোকানে পড়ে থাকা ১ লক্ষ ৮০ হাজার বই ও ২০ হাজার লিটল ম্যাগাজিন পৌঁছায় ইউনিভার্সিটি অফ পেনিসিলভানিয়ার লাইব্রেরিতে। শুরু হয় ক্যাটালগিং- এর কাজ। প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়, " Wise Men Fish Here " যে নাম রেখেছিলেন স্টেলাফের স্বামী তাঁর স্ত্রীর দোকানের মোটো হিসেবে। রট আয়রনে ডিজাইন করা লোগোটি লাগানো থাকত দোকানের মাথাতেই।


গথাম বুক মার্টের লিটল ম্যাগাজিন ক্যাটালগ

ক্যাটালগিং শেষ করতে সময় লেগেছে দশ বছর। পাওয়া গিয়েছে বহু দুষ্প্রাপ্য বই, পত্র- পত্রিকা ও বেড়ালের পশম। ( যা তাঁদেরকে রীতিমতো ঝেড়ে পরিষ্কার করতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে। স্টেলাফ এবং ব্রাউন, দু'জনেরই বেড়াল প্রীতি ছিল দেখবার মতো। ক্রেতা আসুন অথবা না আসুন, গুটিকয়েক বেড়াল হামেশাই ঘুরে বেড়াতো, খেলা করতো, ঘুমোতো বইয়ের থাকেই।) দুষ্প্রাপ্য লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে পাওয়া গিয়েছে ' পার্টিসান রিভিউ ', 'পোয়েট্রি ', 'লিটল রিভিউ ', ' স্টোরি ' কিংবা ' ট্রানজিশন ' এর মতো পত্রিকা যেখানে টি.এস. এলিয়ট কিংবা স্টেইনের হাত ধরে উঠে আসছে মডার্নিজম। পেনিসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান ডেভিড ম্যাকনাইট এই সমস্ত লিটল ম্যাগাজিন ডিজিটাইজ করে তৈরী করে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক পাঠকের কথা ভেবে এক উন্মুক্ত আর্কাইভ।

Comments