।। লিটল ম্যাগাজিনের টাকা আমদানি, মার্কেটিং, প্রোমোশন ও বিজ্ঞাপন ।।
সুশোভন রায়চৌধুরী
আমরা জানি সারা পৃথিবী ব্যাপী লিটল ম্যাগাজিন কোনো মুনাফা লাভের আশায় প্রকাশিত হয় না এবং একই সঙ্গে পত্রিকার চারিত্রিক বৈশিষ্ট পপুলার কালচার বিরোধি। বাংলা লিটল ম্যাগাজিন কর্মীরা প্রতিনিয়ত পত্রিকার অর্থনৈতিক অসংগতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, সগর্বে বলেন, তাঁরা আসাধ্যকে সাধন করে চলেছেন। কিন্তু এই কর্মীরা আর কতদিন টাকা নেই বলে হাহুতাশ করবেন? দেখাতে চাইবেন নিজেকে করুণার পাত্র হিসেবে? একটি পত্রিকাকে দীর্ঘমেয়াদি করতে গেলে অর্থ যে অন্যতম সম্বল সেই ধ্রুব সত্যকে কি অস্বীকার করতে পারেন? না। পারা যায় না বলেই ১৯২০ থেকে ১৯৩০ এর মধ্যবর্তী সময়ে ইয়োরোপীয় মডার্নিস্ট লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকেরা গ্রহণ করেছিলেন টাকা আমদানি ও পত্রিকার মার্কেটিং সম্পর্কিত কিছু অভিনব তরকিব। যে পদ্ধতির কিছু অংশ আজও বাংলা বাজারে ব্যবহৃত হলে অনেকেই উষ্মা প্রকাশ করেন হয়ে পড়েন তত্ত্ব- চিন্তায় দ্বিধাগ্রস্থ ।
লিটল ম্যাগ ' Exchanges ' এর সম্পাদক এজরা পাউন্ড যখন তাঁর পত্রিকার বেশ কিছু সৌজন্য সংখ্যা পাঠান লেখক অ্যালানা হারপারের কাছে, তিনি পাঠিয়েছিলেন একটি চিঠি। চিঠিতে এজরা পাউন্ড লেখেন, ' আপনার ব্যক্তিগত সৌজন্য কপিটা বাদে এতগুলো কপি পাঠালুম কোনো রকম দয়া দেখাতে নয়। এটা নিতান্তই আমার পত্রিকার পাবলিসিটির স্বার্থে। ' যত ছোটোই হোক না কেন, একটি পত্রিকাকে বেঁচে থাকতে গেলে যে ক্রমাগত বাড়াতে হবে তার পাঠক সংখ্যা, তা এজরা পাউন্ড ভালো করেই অনুভব করেছিলেন। পাঠককে আকৃষ্ট করতে ও পত্রিকার অর্থনৈতিক পরিকাঠামোকে চাঙ্গা রাখতে সমসাময়িক লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকেরা গ্রহণ করেছেন বিভিন্ন রকম পদ্ধতি। সম্পাদক ফোর্ড ম্যাডক্স ফোর্ড তাঁর সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিনের নামটাই রেখেছিলেন ' The Translantic Review ' যাতে করে তা আকৃষ্ট করে বিজ্ঞাপন দাতাদের। ( বিজ্ঞাপন দাতারা বুঝতেন এই পত্রিকায় সমালোচনা হবে বিভিন্ন ভাষাকে কেন্দ্র করে ফলে ছড়াবে বহু দেশে। )
বাংলায় যেমন বিভিন্ন মফস্বলের লেখক ও সম্পাদকেরা হতে চান কলকাতা অভিমুখী তেমনই বিশের দশকে ইয়োরোপীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের মধ্যে ছিল ফ্রান্সের রাজধানী পাহৃ( Paris) অভিমুখীতা। কারণটা খুব সহযেই অনুমেয়। সেই সময়ে পাহৃ হয়ে উঠেছে শিল্প- সাহিত্য আড্ডার ইয়োরোপীয় কেন্দ্র। থাকতো আত্মপ্রচার ও প্রকাশনা ব্যাপ্তির সুবর্ণ সুযোগ। আমেরিকান বা ব্রিটিশ 'লিটল' সম্পাদকদের মধ্যে যে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙখা একেবারেই ছিল না তা নয় তবে তাঁদের সম্পাদিত পত্রিকার আড্ডা থেকে বিক্রিবাটরা সবকিছু পাহৃ নির্ভরশীল করে তোলবার পেছনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনই আমার কাছে মূল কারণ বলে মনে হয়েছে। সেই সময়ে একটি লিটল ম্যাগাজিনকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে কীরকম অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর প্রয়োজন ছিল তা বুঝতে গেলে দেখতে হবে সম্পাদকেরা টাকা পেতেন কোথা থেকে। আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইয়োরোপীয় অর্থনীতির খাতায় কতটাই বা রসদ বরাদ্দ ছিল লিটল ম্যাগাজিনের জন্যে? ১৯২০ নাগাদ ধসে পড়েছিল ইয়োরোপের অর্থনীতি। ফলে এক দেশ থেকে অপর দেশে খুব কম খরচেই স্থানান্তরিত হচ্ছিলেন মানুষ, সে উচ্চবিত্ত হোন অথবা মধ্যবিত্ত। কমেছিল ছাপাখানার খরচও। তখন বহু মানুষই আকৃষ্ট হয়েছেন পত্রিকা প্রকাশে, খুলেছিল বহু প্রকাশনী সংস্থাও। কম এক্সচেঞ্জ রেট ও কম প্রিন্টিং চার্জে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হলেও সেই খরচ কিন্তু সম্পাদকদের কাছে কম ছিল না কারণ একই অর্থনীতির ঘেরাটোপে তাঁদের ব্যক্তিগত উপার্জনও ছিল কম। তাই প্রথম দিকে সম্পাদকীয় ভর্তুকিতেই প্রকাশিত হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন। লিটল ম্যাগাজিন Secession ও Gargoyle কে উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে যাদের প্রকাশ সম্পাদকের ব্যক্তিগত উপার্জন ও সামান্য কিছু স্পনসরের বাদান্যতাতেই।
Secession সম্পাদক গরহ্যাম মুনসন তাঁর আত্মজীবনী ' The Awakening Twenties' এ লিখেছেন, কী ভাবে তিনি তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে করে আমেরিকা থেকে ইয়োরোপ পাড়ি দিয়েছিলেন। ইয়োরোপে একবছর থাকবার চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন স্কুল মাস্টারির টাকা ও তাঁর সঞ্চয়ের ইউ এস ডলারের বেশি মূল্য পাওয়ার ওপর নির্ভর করে। Secession এর মোট ৮ টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। Gargoyle প্রকাশিত হয় জুলাই, ১৯২১ থেকে ডিসেম্বর ১৯২২ এর মধ্যে। এটির সম্পাদকদ্বয় আর্থার মস ও ফ্লোরেন্স গিলিয়াম যুক্ত ছিলেন ফ্রিল্যান্স সাহিত্য চর্চায় যা থেকে উপার্জিত অর্থ তাঁরা ব্যায় করেছেন Gargoyle প্রকাশে। আবার লিটল ম্যাগাজিন Transition সম্পাদক ইগুয়েন জোলাস হোন অথবা তাঁর পত্রিকার গবেষক ডগলাস ম্যাকমিলান, কেউ কখনও পত্রিকার অর্থনৈতিক যোগান সূত্রটি লিখিত আকারে জানাননি। আমরা জানতে পারি তাঁর স্ত্রী মারিয়া জোলাসের আত্মজীবনী ' Dateline' থেকে। মারিয়ার পৈত্রিক সম্পত্তিই যে পত্রিকার অর্থনীতিকে চাঙ্গা রেখেছিল সেটি উল্লেখ করেছেন মারিয়া। এজরা পাউন্ড সম্পাদিত Exchanges এর অর্থনৈতিক সাহায্য আসতো পাউন্ডের তিন বন্ধু আগা খান, পৌলিন দিলীপ সিং তৌরি ও রাজকুমারী এডমান্ড ডি পলিগন্যাকের থেকে। লিটল ম্যাগাজিন ' Broom ' এর সম্পাদক হ্যারল্ড লোয়েব তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও স্থায়ী নিবাস গাগেনহেইমের আত্মীয়স্বজনের অনুদানে প্রকাশ করেছেন যাবতীয় সংখ্যা। This Quarter এর সম্পাদক ইথেল মুরহেড তাঁর পত্রিকার জন্যে অর্থ সাহায্য পেয়েছেন তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু ফ্রান্সেস মেরি পার্কারের থেকে যিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি মরোণোত্তর লিখে দিয়ে যান This Quarter এর নামে। তাঁর যুগ্ম সম্পাদক আর্নেস্ট ওয়েলসের মৃত্যুর পর মুরহেড তাঁর পত্রিকার সত্ত্ব বিক্রি করেন বিশিষ্ট সংগ্রাহক ও বইয়ের দোকানের মালিক এডওয়ার্ড টাইটাসকে যিনি বিত্তশালী কসমেটিক ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হেলেনা রুবিনস্টাইনের স্বামী। J. সালেমসন সম্পাদিত লিটল ম্যাগ Tambour এর প্রকাশ সম্ভব হয়েছিল, সম্পাদকের নিজের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি দিয়ে। এদের মধ্যে ' Booster ' এর স্পনসরশিপটা একেবারেই আলাদা। টাকার জন্যে সম্পাদক নির্ভর করেছেন আমেরিকান গল্ফ ও কাউন্টি ক্লাবের ওপর যাঁরা তাঁকে অর্থ সাহায্যে রাজি হন পত্রিকার পাতায় ক্লাবের খবর ছাপানোর বিনিময়ে। প্রথম চারটি সংখ্যায় ক্লাবের খবর ছাপানোর পর, সম্পাদকের উপলব্ধি -- এতে হারিয়ে যাচ্ছে পত্রিকার চারিত্রিক বৈশিষ্ট। ফলে পত্রিকার নাম বদলে রাখেন ' Delta ' ও পত্রিকার খরচ চালাতে থাকেন নিজের পকেট থেকেই। নিজের ক্ষমতায় তিনি প্রকাশ করতে পেরেছিলেন মোট তিনটি সংখ্যা।
বিশের দশকে লিটল ম্যাগাজিনের জন্যে টাকা আমদানির একটা বিশেষ পদ্ধতি চাগাড় দিয়ে উঠেছিল ইয়োরোপে। যাকে বলা হতো Selling of Interest! তখনকার ইয়োরোপে এলিট শ্রেণির বহু মানুষই অর্থনৈতিক ভাবে বিত্তশীল হলেও তাঁদের প্রত্যেকেরই যে সাহিত্য জগতে নামডাক ছিল তা নয়। কোনো বাবুর যদি ইচ্ছে হতো সাহিত্য জগতে বিনা খাটুনিতে নাম কেনবার তিনি দারস্থ হতেন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের। বলতেন, পত্রিকা ছাপানোর সম্পূর্ণ খরচ আমার। বিনিময়ে যেন প্রচ্ছদে সহযোগী সম্পাদক হিসেবে নামটুকু থাকে! ঠিক এরকমই এক ব্যক্তির প্রস্তাব গ্রহণ করতে দেখা যায়, লিটল ম্যাগাজিন The New Review সম্পাদক স্যামুয়েল পুটনামকে, ১৯৩১ সালে। এর পরেও এই পত্রিকার প্রকাশিত হয়েছিল মাত্র পাঁচটি সংখ্যা। যা থেকে একটা বিষয় আমাদের কাছে পরিষ্কার। সেই সময়ে সম্পাদকেরা যতই স্পনসর পান না কেন চাহিদা অনুপাতে সংগৃহীত অর্থ হতো কম। ফলে দীর্ঘমেয়াদি হয়নি পত্রিকাগুলি। ( অবশ্য টাকাই সব নয়, পত্রিকার কনটেন্ট পাঠকের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল সেটাও দেখবার বিষয়।)
পত্রিকাকে দীর্ঘমেয়াদি করতে তখন সম্পাদকেরা নিতে শুরু করলেন ভিন্ন পদ্ধতি। তাঁরা তাঁদের প্রতিটি সংখ্যাকে করে তুলতে চাইলেন সংগ্রহযোগ্য, যাকে বলে কালেক্টর 'স ডিলাইট। প্রচ্ছদ, অলংকরণ ও পাতার গুণগত মানের দিকে নজর দিতে শুরু করলেন। লিটল ম্যাগ Broom এর সম্পাদক হ্যারল্ড ওয়েব নিজেই স্বীকার করেছেন তাঁর পত্রিকার বিক্রি বাড়াতে হাত মিলিয়ে ছিলেন এক গায়ে মাখার সাবান কোম্পানি de luxe এর সঙ্গে। পাঠকের উদ্দেশে সম্পাদকের বার্তা, ' পত্রিকার এখনো পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিটি কপি যে পাঠকের সংগ্রহে থাকবে তিনি পাবেন de luxe সাবানের সম্পূর্ণ সেট। ' আবার লিটল ম্যাগাজিন Translantic Review শুরু করলো প্রথম বছরের ছ'টি প্রকাশিত সংখ্যার সংকলন কাপড় অথবা চামড়া দিয়ে বাঁধাই করে পরিবেশন করতে। এই দৃষ্টিনন্দন অবয়ব আকৃষ্ট করেছিল সংগ্রাহকদের। কাপড় বাঁধাই সংস্করণের দাম হতো ৫০ ও চামড়ার ৭৫ ফ্রাঙ্কস। এই সময়ে লিটল ম্যাগাজিন Transition নিয়ে এলো তাঁদের পথম অফার --- ' Transition এর নির্বাচিত সেট '। ( প্রথম ১২ টি সংখ্যা একত্রিত করে) '১৫০ ফ্রাঙ্কস অথবা ৬ ডলার, বাঁধাই বিহীন, পোস্টাল চার্জ বহন করবে পত্রিকা দপ্তর '। Transition সম্পাদক এখানেই থেমে থাকেননি। কেন পাঠক সংগ্রহ করবেন তাঁর কাগজ, তার বিজ্ঞাপনী প্রচারটিও সূচারু ভাবে করেন পত্রিকার পাতায়। লেখেন, " Most Magazines are worthless a month after it's appearance.Transition is one review whose back numbers increase continually in value."
লিটল ম্যাগাজিন Close-Up এর সম্পাদকই বা মার্কেটিং এ পিছিয়ে থাকেন কেন? তিনিও পত্রিকার অর্থনৈতিক পরিকাঠামোকে মজবুত করতে শুরু করলেন পুরোনো সংখ্যা বাঁধাই করে বেচা। এই কাজের সমর্থনে তাঁর বক্তব্য, " Close-Up makes rapid progress every month.The demand for earlier number is enormous.When they are sold their value will be trebled.To buy a volume is an investment which you will be wise to make. "
Tambour সম্পাদক সালেমসন নিয়েছিলেন ভিন্ন পন্থা। তিনি একটি সংখ্যার ২৫০ কপি ছাপেন ও একই সংখ্যার প্রতিটি কপির একটি আলাদা নম্বর ধার্য করেন, ১ থেকে ২৫০ অবধি। ফলে টাকার বাণ্ডিলের মতো একই সংখ্যার সিরিয়াল নম্বর ধরে কপি সংগ্রহ করা বাতিকে পরিণত হয় কিছু সংখ্যক সংগ্রাহকের কাছে। সংখ্যা বিক্রির এই মরিয়া প্রচেষ্টা যে শুধু ইয়োরোপীয় সম্পাদকেরাই করেছেন তা নয়, সামিল হয়েছিলেন অ্যাঙ্গলো আমেরিকান সম্পাদকেরাও। আমেরিকাতে এই প্রবণতা শুরু হওয়ার কারণ বোধ হয় দু' টো। এক, ফ্র্যাঙ্কোফোনিক লিটল এর সঙ্গে অ্যাঙ্গলোফোনিকেরা যে পাল্লা দিয়েই চলেন তা বোঝানো ও বিশুদ্ধ অর্থনীতি তো আছেই।
এতক্ষণ দেখছিলাম বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের নেওয়া বাণিজ্যিক পন্থাগুলি। হয়তো অনেকেরই আমার মতো মনে হচ্ছে, এলিট বনাম পপুলার কালচারের যে তাত্ত্বিক বিরোধ তা ক্রমশ ফিকে হয়ে পড়ছে না এই পদ্ধতি গ্রহণে? হচ্ছে। এবং এখন থেকে ১০২ বছর আগেই যে এই পদ্ধতি চালু হয়ে গিয়েছিল সেটা দেখানোই আমার উদ্দেশ্য।
এবারের উদাহরণ একটু অন্যরকমের। এজরা পাউন্ড তাঁর পত্রিকা ' Exchanges ' ছাপাতেন তিনটি আলাদা ধরনের কাগজে। বেশি সংখ্যক কপি প্রকাশিত হতো কমা কোয়ালিটির papier alfa bouffant দিয়ে, আর কম সংখ্যক কপি প্রকাশ পেয়েছে ভালো কোয়ালিটির pur fil lafuma ও Papier Hollande দিয়ে। Exchanges এর প্রথম চারটি সংখ্যার ক্ষেত্রে পত্রিকা ছাপা হয় দেড়শো কপি যার প্রথম একশো কপি হয়েছিল lafuma দিয়ে ও বাদ বাকি Hollande দিয়ে। পঞ্চম সংখ্যা থেকে প্রথম দশ কপি Hollande তে ও পরবর্তী দশ কপি lafuma তে। বাকি ১৩০ কপি প্রকাশিত হয়েছে bouffant দিয়েই। অর্থাৎ সাধারণ পাঠক ও সংগ্রাহকদের আলাদা রকম কপি প্রস্তুত করেছেন পাউন্ড।
যে মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি এই মডার্নিস্ট লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকেরা ব্যবহার করেছেন তার মধ্যে সব চেয়ে common হলো পুরোনো সংখ্যাকে দুষ্প্রাপ্য বলে বাজারে চালানো। ' This Quarter ' সম্পাদক মুরহেড পুরোনো কপি বিক্রি করতেন তাঁর সাক্ষরিত কপি হিসেবে। পত্রিকার পাতায় লিখেছেন, " Back number of THIS QUARTER are of increasing value."
লিটল ম্যাগ Broom এর সম্পাদকমণ্ডলীকে দেখা যায় বিভিন্ন বই ও পত্রিকা ডিস্ট্রিবিউটারদের উদ্দেশে বলছেন ' সাবস্ক্রিপশন ' করতে। এরপর তাঁরা পুরোদস্তুর মার্কেটিং স্টাইলে লেখেন, " Copies of Broom are more eagerly sort after,snatched up, devoured,worn,dog-eared, borrowed than any other magazines in the United States.Copies are even known to have been stolen by desparate individuals."
১৯২০ থেকে ১৯৩০ সময়কালে, সমসাময়িক লিটল ম্যাগাজিন একে অপরের বিজ্ঞাপন করবেন, লিখবেন একে অপরকে নিয়ে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই সময়কালে দেখা যাচ্ছে, সাময়িক পত্র ও বাণিজ্যিক পত্রিকায় 'লিটল' বিষয়ক লেখা ও বিজ্ঞাপন প্রকাশের মাত্রা নেহাত কম নয়। Mercure de France, Le Figaro কিংবা সাপ্তাহিক La Semaine de Paris এ পাওয়া যায় লিটল ম্যাগাজিন বিষয়ক আলোচনা। এটি এমন এক সময়, যখন মডার্নিজম নমনীয় করে তুলছে 'লিটল' এর এলিটীয় মনোভাবকে, তৈরি করছে এলিট ও পপুলার কালচারের এক অদৃশ্য সাঁকো।
বিশের দশক ছিল ইয়োরোপীয় বিজ্ঞাপনের দশক। লিটল হোক বা বাণিজ্যিক, বিজ্ঞাপনী- ভাষা থেকে শুরু করে ডিজাইন লে- আউট সবেতেই ছিল মডার্নিজমের ছোঁয়া। সেই সময়ের বেশ কিছু লিটল ম্যাগাজিন যেমন তাঁদের অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর কথা ভেবে বাধবিচার করেনি পণ্যের, দেখা গিয়েছে এরকম লিটলও যাঁরা নিজেদের আবদ্ধ রেখেছিলেন লিটল ম্যাগ, সাময়িকপত্র, বই, বইয়ের দোকান কিংবা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে। দেখবার বিষয়টি হলো, তাঁরা কখনও পত্রিকার ভেতরে লেখার সঙ্গে বিজ্ঞাপন ছাপেননি। ' Adverts Section' রূপে সংখ্যার শুরু অথবা শেষে থাকতো যাবতীয় বিজ্ঞাপন।
এই সহজ বিষয়টি বুঝতে আমাদের অসুবিধে হওয়ার কথা নয়, ১৯২০ থেকে ১৯৩০ এর মধ্যে প্রকাশিত মডার্নিস্ট লিটল ম্যাগাজিন তাঁদের কনটেন্টের চারিত্রিক বৈশিষ্ট বজায় রেখেই হেঁটেছে মার্কেটিং, প্রোমোশন ও বিজ্ঞাপনের পথে যার উদ্দেশ্য একটাই, পত্রিকাকে বাঁচিয়ে রাখা, করে তোলা দীর্ঘমেয়াদি।
' তত্ত্ব ' বড়ো নাকি বড়ো পত্রিকার 'জীবন '? প্রশ্নের উত্তর আমাদের খুঁজে নিতে হবে নিজের মতো করেই।
যদি পত্রিকাই না থাকে, তত্ত্বের প্রয়োগ আমরা দেখাবো কোথায়!
আমরা জানি সারা পৃথিবী ব্যাপী লিটল ম্যাগাজিন কোনো মুনাফা লাভের আশায় প্রকাশিত হয় না এবং একই সঙ্গে পত্রিকার চারিত্রিক বৈশিষ্ট পপুলার কালচার বিরোধি। বাংলা লিটল ম্যাগাজিন কর্মীরা প্রতিনিয়ত পত্রিকার অর্থনৈতিক অসংগতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, সগর্বে বলেন, তাঁরা আসাধ্যকে সাধন করে চলেছেন। কিন্তু এই কর্মীরা আর কতদিন টাকা নেই বলে হাহুতাশ করবেন? দেখাতে চাইবেন নিজেকে করুণার পাত্র হিসেবে? একটি পত্রিকাকে দীর্ঘমেয়াদি করতে গেলে অর্থ যে অন্যতম সম্বল সেই ধ্রুব সত্যকে কি অস্বীকার করতে পারেন? না। পারা যায় না বলেই ১৯২০ থেকে ১৯৩০ এর মধ্যবর্তী সময়ে ইয়োরোপীয় মডার্নিস্ট লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকেরা গ্রহণ করেছিলেন টাকা আমদানি ও পত্রিকার মার্কেটিং সম্পর্কিত কিছু অভিনব তরকিব। যে পদ্ধতির কিছু অংশ আজও বাংলা বাজারে ব্যবহৃত হলে অনেকেই উষ্মা প্রকাশ করেন হয়ে পড়েন তত্ত্ব- চিন্তায় দ্বিধাগ্রস্থ ।
লিটল ম্যাগ ' Exchanges ' এর সম্পাদক এজরা পাউন্ড যখন তাঁর পত্রিকার বেশ কিছু সৌজন্য সংখ্যা পাঠান লেখক অ্যালানা হারপারের কাছে, তিনি পাঠিয়েছিলেন একটি চিঠি। চিঠিতে এজরা পাউন্ড লেখেন, ' আপনার ব্যক্তিগত সৌজন্য কপিটা বাদে এতগুলো কপি পাঠালুম কোনো রকম দয়া দেখাতে নয়। এটা নিতান্তই আমার পত্রিকার পাবলিসিটির স্বার্থে। ' যত ছোটোই হোক না কেন, একটি পত্রিকাকে বেঁচে থাকতে গেলে যে ক্রমাগত বাড়াতে হবে তার পাঠক সংখ্যা, তা এজরা পাউন্ড ভালো করেই অনুভব করেছিলেন। পাঠককে আকৃষ্ট করতে ও পত্রিকার অর্থনৈতিক পরিকাঠামোকে চাঙ্গা রাখতে সমসাময়িক লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকেরা গ্রহণ করেছেন বিভিন্ন রকম পদ্ধতি। সম্পাদক ফোর্ড ম্যাডক্স ফোর্ড তাঁর সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিনের নামটাই রেখেছিলেন ' The Translantic Review ' যাতে করে তা আকৃষ্ট করে বিজ্ঞাপন দাতাদের। ( বিজ্ঞাপন দাতারা বুঝতেন এই পত্রিকায় সমালোচনা হবে বিভিন্ন ভাষাকে কেন্দ্র করে ফলে ছড়াবে বহু দেশে। )
![]() |
| The Translantic Review |
বাংলায় যেমন বিভিন্ন মফস্বলের লেখক ও সম্পাদকেরা হতে চান কলকাতা অভিমুখী তেমনই বিশের দশকে ইয়োরোপীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের মধ্যে ছিল ফ্রান্সের রাজধানী পাহৃ( Paris) অভিমুখীতা। কারণটা খুব সহযেই অনুমেয়। সেই সময়ে পাহৃ হয়ে উঠেছে শিল্প- সাহিত্য আড্ডার ইয়োরোপীয় কেন্দ্র। থাকতো আত্মপ্রচার ও প্রকাশনা ব্যাপ্তির সুবর্ণ সুযোগ। আমেরিকান বা ব্রিটিশ 'লিটল' সম্পাদকদের মধ্যে যে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙখা একেবারেই ছিল না তা নয় তবে তাঁদের সম্পাদিত পত্রিকার আড্ডা থেকে বিক্রিবাটরা সবকিছু পাহৃ নির্ভরশীল করে তোলবার পেছনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনই আমার কাছে মূল কারণ বলে মনে হয়েছে। সেই সময়ে একটি লিটল ম্যাগাজিনকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে কীরকম অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর প্রয়োজন ছিল তা বুঝতে গেলে দেখতে হবে সম্পাদকেরা টাকা পেতেন কোথা থেকে। আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইয়োরোপীয় অর্থনীতির খাতায় কতটাই বা রসদ বরাদ্দ ছিল লিটল ম্যাগাজিনের জন্যে? ১৯২০ নাগাদ ধসে পড়েছিল ইয়োরোপের অর্থনীতি। ফলে এক দেশ থেকে অপর দেশে খুব কম খরচেই স্থানান্তরিত হচ্ছিলেন মানুষ, সে উচ্চবিত্ত হোন অথবা মধ্যবিত্ত। কমেছিল ছাপাখানার খরচও। তখন বহু মানুষই আকৃষ্ট হয়েছেন পত্রিকা প্রকাশে, খুলেছিল বহু প্রকাশনী সংস্থাও। কম এক্সচেঞ্জ রেট ও কম প্রিন্টিং চার্জে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হলেও সেই খরচ কিন্তু সম্পাদকদের কাছে কম ছিল না কারণ একই অর্থনীতির ঘেরাটোপে তাঁদের ব্যক্তিগত উপার্জনও ছিল কম। তাই প্রথম দিকে সম্পাদকীয় ভর্তুকিতেই প্রকাশিত হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন। লিটল ম্যাগাজিন Secession ও Gargoyle কে উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে যাদের প্রকাশ সম্পাদকের ব্যক্তিগত উপার্জন ও সামান্য কিছু স্পনসরের বাদান্যতাতেই।
![]() |
| Secession , July 1923 issue |
Secession সম্পাদক গরহ্যাম মুনসন তাঁর আত্মজীবনী ' The Awakening Twenties' এ লিখেছেন, কী ভাবে তিনি তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে করে আমেরিকা থেকে ইয়োরোপ পাড়ি দিয়েছিলেন। ইয়োরোপে একবছর থাকবার চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন স্কুল মাস্টারির টাকা ও তাঁর সঞ্চয়ের ইউ এস ডলারের বেশি মূল্য পাওয়ার ওপর নির্ভর করে। Secession এর মোট ৮ টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। Gargoyle প্রকাশিত হয় জুলাই, ১৯২১ থেকে ডিসেম্বর ১৯২২ এর মধ্যে। এটির সম্পাদকদ্বয় আর্থার মস ও ফ্লোরেন্স গিলিয়াম যুক্ত ছিলেন ফ্রিল্যান্স সাহিত্য চর্চায় যা থেকে উপার্জিত অর্থ তাঁরা ব্যায় করেছেন Gargoyle প্রকাশে। আবার লিটল ম্যাগাজিন Transition সম্পাদক ইগুয়েন জোলাস হোন অথবা তাঁর পত্রিকার গবেষক ডগলাস ম্যাকমিলান, কেউ কখনও পত্রিকার অর্থনৈতিক যোগান সূত্রটি লিখিত আকারে জানাননি। আমরা জানতে পারি তাঁর স্ত্রী মারিয়া জোলাসের আত্মজীবনী ' Dateline' থেকে। মারিয়ার পৈত্রিক সম্পত্তিই যে পত্রিকার অর্থনীতিকে চাঙ্গা রেখেছিল সেটি উল্লেখ করেছেন মারিয়া। এজরা পাউন্ড সম্পাদিত Exchanges এর অর্থনৈতিক সাহায্য আসতো পাউন্ডের তিন বন্ধু আগা খান, পৌলিন দিলীপ সিং তৌরি ও রাজকুমারী এডমান্ড ডি পলিগন্যাকের থেকে। লিটল ম্যাগাজিন ' Broom ' এর সম্পাদক হ্যারল্ড লোয়েব তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও স্থায়ী নিবাস গাগেনহেইমের আত্মীয়স্বজনের অনুদানে প্রকাশ করেছেন যাবতীয় সংখ্যা। This Quarter এর সম্পাদক ইথেল মুরহেড তাঁর পত্রিকার জন্যে অর্থ সাহায্য পেয়েছেন তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু ফ্রান্সেস মেরি পার্কারের থেকে যিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি মরোণোত্তর লিখে দিয়ে যান This Quarter এর নামে। তাঁর যুগ্ম সম্পাদক আর্নেস্ট ওয়েলসের মৃত্যুর পর মুরহেড তাঁর পত্রিকার সত্ত্ব বিক্রি করেন বিশিষ্ট সংগ্রাহক ও বইয়ের দোকানের মালিক এডওয়ার্ড টাইটাসকে যিনি বিত্তশালী কসমেটিক ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হেলেনা রুবিনস্টাইনের স্বামী। J. সালেমসন সম্পাদিত লিটল ম্যাগ Tambour এর প্রকাশ সম্ভব হয়েছিল, সম্পাদকের নিজের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি দিয়ে। এদের মধ্যে ' Booster ' এর স্পনসরশিপটা একেবারেই আলাদা। টাকার জন্যে সম্পাদক নির্ভর করেছেন আমেরিকান গল্ফ ও কাউন্টি ক্লাবের ওপর যাঁরা তাঁকে অর্থ সাহায্যে রাজি হন পত্রিকার পাতায় ক্লাবের খবর ছাপানোর বিনিময়ে। প্রথম চারটি সংখ্যায় ক্লাবের খবর ছাপানোর পর, সম্পাদকের উপলব্ধি -- এতে হারিয়ে যাচ্ছে পত্রিকার চারিত্রিক বৈশিষ্ট। ফলে পত্রিকার নাম বদলে রাখেন ' Delta ' ও পত্রিকার খরচ চালাতে থাকেন নিজের পকেট থেকেই। নিজের ক্ষমতায় তিনি প্রকাশ করতে পেরেছিলেন মোট তিনটি সংখ্যা।
বিশের দশকে লিটল ম্যাগাজিনের জন্যে টাকা আমদানির একটা বিশেষ পদ্ধতি চাগাড় দিয়ে উঠেছিল ইয়োরোপে। যাকে বলা হতো Selling of Interest! তখনকার ইয়োরোপে এলিট শ্রেণির বহু মানুষই অর্থনৈতিক ভাবে বিত্তশীল হলেও তাঁদের প্রত্যেকেরই যে সাহিত্য জগতে নামডাক ছিল তা নয়। কোনো বাবুর যদি ইচ্ছে হতো সাহিত্য জগতে বিনা খাটুনিতে নাম কেনবার তিনি দারস্থ হতেন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের। বলতেন, পত্রিকা ছাপানোর সম্পূর্ণ খরচ আমার। বিনিময়ে যেন প্রচ্ছদে সহযোগী সম্পাদক হিসেবে নামটুকু থাকে! ঠিক এরকমই এক ব্যক্তির প্রস্তাব গ্রহণ করতে দেখা যায়, লিটল ম্যাগাজিন The New Review সম্পাদক স্যামুয়েল পুটনামকে, ১৯৩১ সালে। এর পরেও এই পত্রিকার প্রকাশিত হয়েছিল মাত্র পাঁচটি সংখ্যা। যা থেকে একটা বিষয় আমাদের কাছে পরিষ্কার। সেই সময়ে সম্পাদকেরা যতই স্পনসর পান না কেন চাহিদা অনুপাতে সংগৃহীত অর্থ হতো কম। ফলে দীর্ঘমেয়াদি হয়নি পত্রিকাগুলি। ( অবশ্য টাকাই সব নয়, পত্রিকার কনটেন্ট পাঠকের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল সেটাও দেখবার বিষয়।)
![]() |
| The New Review , January-February 1931 |
পত্রিকাকে দীর্ঘমেয়াদি করতে তখন সম্পাদকেরা নিতে শুরু করলেন ভিন্ন পদ্ধতি। তাঁরা তাঁদের প্রতিটি সংখ্যাকে করে তুলতে চাইলেন সংগ্রহযোগ্য, যাকে বলে কালেক্টর 'স ডিলাইট। প্রচ্ছদ, অলংকরণ ও পাতার গুণগত মানের দিকে নজর দিতে শুরু করলেন। লিটল ম্যাগ Broom এর সম্পাদক হ্যারল্ড ওয়েব নিজেই স্বীকার করেছেন তাঁর পত্রিকার বিক্রি বাড়াতে হাত মিলিয়ে ছিলেন এক গায়ে মাখার সাবান কোম্পানি de luxe এর সঙ্গে। পাঠকের উদ্দেশে সম্পাদকের বার্তা, ' পত্রিকার এখনো পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিটি কপি যে পাঠকের সংগ্রহে থাকবে তিনি পাবেন de luxe সাবানের সম্পূর্ণ সেট। ' আবার লিটল ম্যাগাজিন Translantic Review শুরু করলো প্রথম বছরের ছ'টি প্রকাশিত সংখ্যার সংকলন কাপড় অথবা চামড়া দিয়ে বাঁধাই করে পরিবেশন করতে। এই দৃষ্টিনন্দন অবয়ব আকৃষ্ট করেছিল সংগ্রাহকদের। কাপড় বাঁধাই সংস্করণের দাম হতো ৫০ ও চামড়ার ৭৫ ফ্রাঙ্কস। এই সময়ে লিটল ম্যাগাজিন Transition নিয়ে এলো তাঁদের পথম অফার --- ' Transition এর নির্বাচিত সেট '। ( প্রথম ১২ টি সংখ্যা একত্রিত করে) '১৫০ ফ্রাঙ্কস অথবা ৬ ডলার, বাঁধাই বিহীন, পোস্টাল চার্জ বহন করবে পত্রিকা দপ্তর '। Transition সম্পাদক এখানেই থেমে থাকেননি। কেন পাঠক সংগ্রহ করবেন তাঁর কাগজ, তার বিজ্ঞাপনী প্রচারটিও সূচারু ভাবে করেন পত্রিকার পাতায়। লেখেন, " Most Magazines are worthless a month after it's appearance.Transition is one review whose back numbers increase continually in value."
লিটল ম্যাগাজিন Close-Up এর সম্পাদকই বা মার্কেটিং এ পিছিয়ে থাকেন কেন? তিনিও পত্রিকার অর্থনৈতিক পরিকাঠামোকে মজবুত করতে শুরু করলেন পুরোনো সংখ্যা বাঁধাই করে বেচা। এই কাজের সমর্থনে তাঁর বক্তব্য, " Close-Up makes rapid progress every month.The demand for earlier number is enormous.When they are sold their value will be trebled.To buy a volume is an investment which you will be wise to make. "
Tambour সম্পাদক সালেমসন নিয়েছিলেন ভিন্ন পন্থা। তিনি একটি সংখ্যার ২৫০ কপি ছাপেন ও একই সংখ্যার প্রতিটি কপির একটি আলাদা নম্বর ধার্য করেন, ১ থেকে ২৫০ অবধি। ফলে টাকার বাণ্ডিলের মতো একই সংখ্যার সিরিয়াল নম্বর ধরে কপি সংগ্রহ করা বাতিকে পরিণত হয় কিছু সংখ্যক সংগ্রাহকের কাছে। সংখ্যা বিক্রির এই মরিয়া প্রচেষ্টা যে শুধু ইয়োরোপীয় সম্পাদকেরাই করেছেন তা নয়, সামিল হয়েছিলেন অ্যাঙ্গলো আমেরিকান সম্পাদকেরাও। আমেরিকাতে এই প্রবণতা শুরু হওয়ার কারণ বোধ হয় দু' টো। এক, ফ্র্যাঙ্কোফোনিক লিটল এর সঙ্গে অ্যাঙ্গলোফোনিকেরা যে পাল্লা দিয়েই চলেন তা বোঝানো ও বিশুদ্ধ অর্থনীতি তো আছেই।
![]() |
| Tambour এর এই সংখ্যার মোট ২০০ কপি ছাপা হয় যার মধ্যে এই কপিটি ১৫৭ তম ( প্রচ্ছদে লেখা ) |
এতক্ষণ দেখছিলাম বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের নেওয়া বাণিজ্যিক পন্থাগুলি। হয়তো অনেকেরই আমার মতো মনে হচ্ছে, এলিট বনাম পপুলার কালচারের যে তাত্ত্বিক বিরোধ তা ক্রমশ ফিকে হয়ে পড়ছে না এই পদ্ধতি গ্রহণে? হচ্ছে। এবং এখন থেকে ১০২ বছর আগেই যে এই পদ্ধতি চালু হয়ে গিয়েছিল সেটা দেখানোই আমার উদ্দেশ্য।
এবারের উদাহরণ একটু অন্যরকমের। এজরা পাউন্ড তাঁর পত্রিকা ' Exchanges ' ছাপাতেন তিনটি আলাদা ধরনের কাগজে। বেশি সংখ্যক কপি প্রকাশিত হতো কমা কোয়ালিটির papier alfa bouffant দিয়ে, আর কম সংখ্যক কপি প্রকাশ পেয়েছে ভালো কোয়ালিটির pur fil lafuma ও Papier Hollande দিয়ে। Exchanges এর প্রথম চারটি সংখ্যার ক্ষেত্রে পত্রিকা ছাপা হয় দেড়শো কপি যার প্রথম একশো কপি হয়েছিল lafuma দিয়ে ও বাদ বাকি Hollande দিয়ে। পঞ্চম সংখ্যা থেকে প্রথম দশ কপি Hollande তে ও পরবর্তী দশ কপি lafuma তে। বাকি ১৩০ কপি প্রকাশিত হয়েছে bouffant দিয়েই। অর্থাৎ সাধারণ পাঠক ও সংগ্রাহকদের আলাদা রকম কপি প্রস্তুত করেছেন পাউন্ড।
যে মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি এই মডার্নিস্ট লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকেরা ব্যবহার করেছেন তার মধ্যে সব চেয়ে common হলো পুরোনো সংখ্যাকে দুষ্প্রাপ্য বলে বাজারে চালানো। ' This Quarter ' সম্পাদক মুরহেড পুরোনো কপি বিক্রি করতেন তাঁর সাক্ষরিত কপি হিসেবে। পত্রিকার পাতায় লিখেছেন, " Back number of THIS QUARTER are of increasing value."
![]() |
| This Quarter মার্কেটিং বিজ্ঞপ্তি |
লিটল ম্যাগ Broom এর সম্পাদকমণ্ডলীকে দেখা যায় বিভিন্ন বই ও পত্রিকা ডিস্ট্রিবিউটারদের উদ্দেশে বলছেন ' সাবস্ক্রিপশন ' করতে। এরপর তাঁরা পুরোদস্তুর মার্কেটিং স্টাইলে লেখেন, " Copies of Broom are more eagerly sort after,snatched up, devoured,worn,dog-eared, borrowed than any other magazines in the United States.Copies are even known to have been stolen by desparate individuals."
![]() |
| Broom এর কিছু সংখ্যার প্রচ্ছদ |
অপর দিকে লিটল ম্যাগাজিন Delta র সম্পাদক লিখছেন, " Delta appears irregularly and is not on sale anywhere.Delta is available only through subscription. Delta can be had for 250 francs for a year. Delta must be prohibitive in price or prohibited. "
লিটল ম্যাগাজিন Secession দ্বিতীয় সংখ্যার একটি পাতার হেডিং হিসেবে দেখা যায়, ' Do you enjoy watching a magazine run risks? ' যার ঠিক নিচেই সম্পাদক লিখেছেন, " Patrons will receive two subscription and special previleges besides within a few month. They will also demonstrate that they are not unworthy descendants of certain perspicacious Elizabethan nobles."
১৯২০-৩০ অন্তরবর্তী সময়ে, যাঁরা মডার্নিস্ট লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশে এগিয়ে এসেছেন তাঁদের ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক খুবই ভালো ছিল। তা সত্ত্বেও সম্পাদনার পাশাপাশি করে গিয়েছেন নিরন্তর প্রোমোশন। অর্থাৎ একটি সংখ্যা প্রকাশের অব্যবহিত পর তাঁরা তাঁদের পরিচিতদের চিঠি লিখে জানাতেন পত্রিকা প্রকাশের খবর, হাজির হতেন বিভিন্ন পার্টি ও নৈশ ভোজে। এই প্রোমোশন ও নেটওয়ার্কিং এর ধকল সম্পাদকদের ওপর এতটাই পড়তো যে Transition সম্পাদক লিখতে বাধ্য হয়েছেন, " Editing the review seemed to entail such an alarming amount of social activity that we decided to look for a space outside the capital, preferably well in the country. "প্রোমোশনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পেত, কোন সম্পাদক কত বেশি প্রতিষ্ঠিত লেখকের লেখা ছাপতে পারছেন তাঁর সংখ্যায়। আমরা জানি একটি পত্রিকা ' লিটল ' হয়ে ওঠে তার প্রকাশিত কনটেন্টের চারিত্রিক বৈশিষ্টে। যদি এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট বজায় রেখেই প্রকাশিত হয় প্রতিষ্ঠিত লেখকের লেখা, সেই লেখকের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে এনক্যাশ করেছে লিটল ম্যাগাজিন! লিটল ম্যাগ ' Exchanges ' এ পাওয়া যাচ্ছে টি.এস. এলিয়ট, অঁদ্রে জিদ, ডি. এইচ. লরেন্স ও ভার্জিনিয়া উলফের মতো প্রতিষ্ঠিতদের। সম্পাদক ফোর্ড হোন অথবা পাউন্ড, লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁরা সাহায্য নিয়েছেন সাহিত্য পরিমণ্ডলের সুপ্রতিষ্ঠিত বন্ধুদের। ফোর্ড সম্পাদিত Translantic Review তে আমরা পাই টি.এস. এলিয়ট, থমাস হার্ডি, জোসেফ কনরাড, এইচ. জি. ওয়েলস, এডওয়ার্ড জেপসন, ডগলাস গোল্ডরিং কিংবা উইন্ডহ্যাম লুইসের নাম। Booster সম্পাদক হেনরি মিলার পত্রিকার জন্যে লেখা চেয়ে যে চিঠি পাঠাতেন প্রতিষ্ঠিত লেখকদের কাছে, তার শিরোনাম হতো ' Special Letter to Celebrities.'!প্রাথমিক পর্যায়ে ইয়োরোপে লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কিত জনসচেতনতা তৈরীতে ছাপানো হতো prospectus. যেখানে থাকতো প্রকাশিতব্য সংখ্যার বিজ্ঞাপন, ' কেন সম্পাদক প্রকাশ করছেন সেই নির্দিষ্ট বিষয়ক লেখা? ', থাকতো সংক্ষিপ্ত লেখক তালিকাও। এই প্রসপেক্টাস বিলি হতো লেখক, পাঠক ও সংবাদপত্রের অফিসে। কিছু ক্ষেত্রে দৈনিক খবরের কাগজের সঙ্গে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যেত এই প্রচারপত্র। এর পরবর্তী ধাপ আর প্রসপেক্টাস নয়, সরাসরি প্রকাশিত সংখ্যার কপি পাঠানো শুরু হয় সংবাদপত্রের দপ্তরে --- এই আশায় যে যদি তাঁরা রিভিউ করেন অন্তত খবর আকারে পত্রিকা পৌঁছোবে বড়ো সংখ্যক পাঠকের কাছে। দৈনিক Paris Tribune এ ইগুয়েন জোলাস ' Through Paris Bookland ' শীর্ষক একটি আলোচনায় লিখেছিলেন, ' It appears a never ending task for a literary editor at a newspaper or review. And still the magazines come in...We have to read them all.' লিটল ম্যাগাজিনকে একটি commodity হিসেবে দেখবার চিন্তা বোধ হয় তখনই তৈরী হয়েছিল, যখন ' বই ' ও 'সাহিত্য'কে মানুষ ' খবর ' আকারে দেখতে চেয়েছেন। সেই সময়ের বেশিরভাগ লিটল ম্যাগাজিন তাঁদের প্রোমোশন চালিয়ে গিয়েছেন অন্যান্য লিটল ম্যাগাজিন, সাময়িকী ও দৈনিকে বিজ্ঞাপন ছাপাবার মাধ্যমে। তখন বিনামূল্যে একে অপরের বিজ্ঞাপন ছাপাতে 'লিটল' সম্পাদকেরা এতটাই বদ্ধপরিকর, যে বিষয়টি হয়ে উঠেছিল New York Times এর খবর। NYT তে লেখা হয়েছে, ' A glance through the advertising pages of Pagany suggests a solution of the problem as to how magazines of this character manage to live. Apparently they live by taking in each other' s advertisements. This issue consists of the adverts of the Left, Blues, Morada, The Front, The New Review, Nativity, Experimental Cinema, New Masses and The Modern Quarterly. "
১৯২০ থেকে ১৯৩০ সময়কালে, সমসাময়িক লিটল ম্যাগাজিন একে অপরের বিজ্ঞাপন করবেন, লিখবেন একে অপরকে নিয়ে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই সময়কালে দেখা যাচ্ছে, সাময়িক পত্র ও বাণিজ্যিক পত্রিকায় 'লিটল' বিষয়ক লেখা ও বিজ্ঞাপন প্রকাশের মাত্রা নেহাত কম নয়। Mercure de France, Le Figaro কিংবা সাপ্তাহিক La Semaine de Paris এ পাওয়া যায় লিটল ম্যাগাজিন বিষয়ক আলোচনা। এটি এমন এক সময়, যখন মডার্নিজম নমনীয় করে তুলছে 'লিটল' এর এলিটীয় মনোভাবকে, তৈরি করছে এলিট ও পপুলার কালচারের এক অদৃশ্য সাঁকো।
![]() |
| Le Figaro |
বিশের দশক ছিল ইয়োরোপীয় বিজ্ঞাপনের দশক। লিটল হোক বা বাণিজ্যিক, বিজ্ঞাপনী- ভাষা থেকে শুরু করে ডিজাইন লে- আউট সবেতেই ছিল মডার্নিজমের ছোঁয়া। সেই সময়ের বেশ কিছু লিটল ম্যাগাজিন যেমন তাঁদের অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর কথা ভেবে বাধবিচার করেনি পণ্যের, দেখা গিয়েছে এরকম লিটলও যাঁরা নিজেদের আবদ্ধ রেখেছিলেন লিটল ম্যাগ, সাময়িকপত্র, বই, বইয়ের দোকান কিংবা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে। দেখবার বিষয়টি হলো, তাঁরা কখনও পত্রিকার ভেতরে লেখার সঙ্গে বিজ্ঞাপন ছাপেননি। ' Adverts Section' রূপে সংখ্যার শুরু অথবা শেষে থাকতো যাবতীয় বিজ্ঞাপন।
![]() |
| ফেব্রুয়ারি , ১৯২৪ এ দ্য ট্রান্সল্যান্টিক রিভিউ তে প্রকাশিত বিজ্ঞাপন |
এই সহজ বিষয়টি বুঝতে আমাদের অসুবিধে হওয়ার কথা নয়, ১৯২০ থেকে ১৯৩০ এর মধ্যে প্রকাশিত মডার্নিস্ট লিটল ম্যাগাজিন তাঁদের কনটেন্টের চারিত্রিক বৈশিষ্ট বজায় রেখেই হেঁটেছে মার্কেটিং, প্রোমোশন ও বিজ্ঞাপনের পথে যার উদ্দেশ্য একটাই, পত্রিকাকে বাঁচিয়ে রাখা, করে তোলা দীর্ঘমেয়াদি।
' তত্ত্ব ' বড়ো নাকি বড়ো পত্রিকার 'জীবন '? প্রশ্নের উত্তর আমাদের খুঁজে নিতে হবে নিজের মতো করেই।
যদি পত্রিকাই না থাকে, তত্ত্বের প্রয়োগ আমরা দেখাবো কোথায়!














Comments
Post a Comment