।। তামিল লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে দু' চার কথা ।।
সুশোভন রায়চৌধুরী
প্রথমেই জানিয়ে রাখা ভালো, তামিল ভাষা আমি পড়তে, লিখতে, বলতে কোনোটাই পারি না। এমনকি শুনলেও বুঝি না। তবে ছাত্র জীবনে বহু তামিল বন্ধু হয়েছে আমার। তারা তাদের মাতৃভাষা ছাড়াও ইংরেজিতেই এতটাই দক্ষ ছিল যে আমরা আমাদের মনের ভাব খুব অনায়াসেই ইংরেজিতে আদান প্রদান করেছি। দক্ষিণ ভারতীয় ভাষাগুলির মধ্যে আমার দৌড় ওই কান্নাড়াতে কাজ চালানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমার আগ্রহের বিষয় যেহেতু লিটল ম্যাগাজিন তাই ইংরেজিতে যেটুকু তথ্য উপলব্ধ তার ওপরে নির্ভর করেই এগোতে চাইছি বাংলা ভাষার তামিল 'লিটল' চর্চা।
তামিলের প্রখ্যাত ছোটো গল্পকার পুদুমাইপ্পিথান শুরু করতে চেয়েছিলেন ' শোধনী ' নামের এক লিটল ম্যাগাজিন। এর মাধ্যমে তিনি ধরতে চাইছিলেন দু' টো বিষয়। এক, তাঁর পত্রিকা হয়ে উঠবে শিল্প ও সাহিত্যের পরীক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম এবং অবশ্যই সাহিত্যের বাণিজ্যিকরণের বিরোধিতা। এটা জেনেই যে সেই সময়ে তামিল ভাষায় ব্যক্তি উদ্যোগে প্রকাশিত পত্রিকার অর্থনীতি খুব একটা সুবিধেজনক ছিল না। শেষ পর্যন্ত তাঁর এই উদ্যোগ বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছিল কিনা তা জানা যায় না। পাশ্চাত্যের মতোই তামিল 'লিটল' এর জন্ম মডার্নিজম বা আধুনিকতাকে কেন্দ্র করে। তামিল লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সূত্রপাত পঞ্চাশের দশকে যখন তামিল কবিতা, ছোটো গল্প ও সাহিত্য সমালোচনায় মডার্নিজম হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ। সত্তরের দশক পর্যন্ত তামিল 'লিটল' এ মডার্নিজমের দাপট চললেও এই দশকেই তামিল জনমানসে ঘটে রাজনৈতিক পালাবদল। এই সময়ে যখন মানুষ ঝুঁকছেন মার্ক্সীয় তত্ত্ব চিন্তায়, তখন স্বাভাবিক ভাবেই শিল্প ও সাহিত্যে, সর্বপরি লিটল ম্যাগাজিনে পড়েছে তার ছাপ। আবার নব্বইয়ের দশকের 'লিটল' ছিল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শের এক অদ্ভূত মিশ্রণ। তখন বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন তত্ত্ব তাঁরা চর্চা করে প্রয়োগ করছেন তামিল লিটল ম্যাগাজিনে।
তামিল লিটল ম্যাগের ইতিহাস চর্চাকারী ভাল্লিকান্নন, তাঁর তামিল ' লিটল ' বিষয়ক বই Tamizhil Sirupathirikaigal এ বেশ কিছু পত্রিকার হদিস দিয়েছেন যা ঠিক ' লিটল ' না হলেও ছিল সাময়িক পত্র। উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে সুব্রমণিয়া ভারতী সম্পাদিত দুটি জাতীয়তাবাদী পত্রিকা ' ইন্ধিয়া ' ও ' চক্রবর্তীনী '।
তামিল ঔপন্যাসিক বি.আর. রাজম আইয়ার ও এ. মাধবৈয়া সম্পাদিত ' বিবেক চিন্তামণি ' ও ' পঞ্চমির্থম ' কিংবা ভারতীর সমসাময়িক ঔপন্যাসিক ভি ভি এস আইয়ার সম্পাদিত ' বালাভারতী '। এগুলিকেই ধরা হয় তামিল লিটল ম্যাগাজিনের পূর্বসূরী হিসেবে।
এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ছিল ' মানিকোড়ি 'যেটি ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। সাপ্তাহিক রাজনীতির কাগজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে শুরুর দিকে মহাত্মা গান্ধীর মতবাদকে প্রচার করলেও পরবর্তীতে হয়ে ওঠে এক বিশুদ্ধ সাহিত্যপত্র। সম্পাদক বি. এস. রামাইয়ার সম্পাদনায় যার ছোটো গল্পের বিভাগটি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল পাঠকের। ' মানিকোড়ি' তে প্রকাশিত হয়েছে তামিল সাহিত্যের খ্যাতনামা লেখক পুদুমাইপ্পিথান, মৌনি, কা. না. সুব্রমনিয়াম ও সি. এস. চেল্লাপ্পার বহু লেখা। পরবর্তীতে যেখানে তামিল লিটল সম্পাদকেরা ' সিরিয়াস সাহিত্যের ' ওপরে জোর দিয়েছেন, সেই ' সিরিয়াস সাহিত্য' ই বি. এস. রামাইয়ার সম্পাদনায় ১৯৩৫ - ৩৯ সময়কালে প্রকাশিত হয়েছে 'মানিকোড়ি' তে। এই ' সিরিয়াস সাহিত্যে' উদ্বুদ্ধ হয়েছেন ' মানিকোড়ি ' পরবর্তী বহু পত্রিকা সম্পাদক। যে কারণে কিছু সংখ্যক তামিল স্কলার ' মানিকোড়ি' কেই তামিল ভাষার প্রথম লিটল ম্যাগাজিন বলে দাবি করেছেন। অবশ্য বিশিষ্ট তামিল লেখক ভি. আরাসুর মত সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর মতে, ' যেহেতু পুদুমাইপ্পিথান, না. পিচামূর্তি কিংবা কু.পা. রাজাগোপালনের লেখা মানিকোড়িতে প্রকাশিত হয়েছে তাই এটিকে ' লিটল ' বলতে হবে? এই পত্রিকার কাজ ছিল একটি আলাদা রকমের বাণিজ্যিক কাগজের মতো, যার না ছিল কোনো নির্দিষ্ট দর্শন, না কোনো সামাজিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা। মানিকোড়ি ছিল ব্রিটিশ বিরোধি ও pro- mirasidars. এটা একটা ঐতিহাসিক ভুল হবে যদি মানিকোড়িকে তামিল 'লিটল' এর পূর্বসূরি কিংবা লিটল ম্যাগাজিন শ্রেণিভুক্ত করা হয় কারণ এই পত্রিকায় সেই বেসিক ইনগ্রেডিয়েন্টগুলোই নেই যা একটি পত্রিকাকে ' লিটল ম্যাগাজিন ' এ রূপান্তরিত করে। '
এখন 'মানিকোড়ি' সম্পূর্ণ ভাবেই তামিল বাণিজ্যিক ' আনন্দ ভিকাতন' এর বিরোধি হলেও এখানে প্রকাশিত হয়েছে এরকম কিছু লেখক যাঁদের বাণিজ্যিক সাহিত্য মহলে যথেষ্ট নাম ডাক ছিল। ফলে লিটল কর্মীদের এলিটীয় মনোভাব কি কোনো ভাবে 'মানিকোড়ি'র লিটল ম্যাগাজিন স্বীকৃতির বিরোধি হয়ে পড়ছে? কারণ, আমরা জানি একটি পত্রিকা ' লিটল ' হয়ে ওঠে তার প্রকাশিত কনটেন্টের চারিত্রিক বৈশিষ্টে। অবশ্য তামিল লিটারারি হিস্টোরিয়ান এ. আর. ভেঙ্কটচলপতির মতে, ' The sharp distinction between mass circulated commercial magazine and self- consciously ' serious ' little magazine did not happen until the beginning of the 1960s. '
ষাটের দশকের শুরুর দিকে, নির্দিষ্ট করে বললে ১৯৬৩ থেকে '৬৫ -র মধ্যে কা. না. সুব্রমনিয়ামের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় লিটল ম্যাগাজিন ' ইলাক্কিয়া ভট্টম ' যাঁরা নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ করেছিলেন অনুবাদ ও সমালোচনায়। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল আভাঁ গার্দে উদ্বুদ্ধ পাশ্চাত্য 'লিটল' এ প্রকাশিত পরীক্ষামূলক কবিতার তামিল অনুবাদ পাঠকের সামনে তুলে ধরা। এই সময়ের বেশির ভাগ ' লিটল' ই যখন হয়ে উঠছে কবিতা কেন্দ্রিক তখন লিটল ম্যাগাজিন ' নাড়াই ' ( ১৯৬৮-৭০) নিয়ে আনলেন তাঁদের বিষয়ে বৈচিত্র। প্রকাশিত হলো অ্যাবসার্ডিস্ট নাটক ও বিভিন্ন চারুকলা শিল্পীর করা স্কেচ ও লাইন ড্রয়িং। যদি তামিল লিটল ম্যাগাজিনে তামিল শিল্প ও সাহিত্যের সর্বাঙ্গীণ চিত্রকে দেখতে হয় তাহলে খুলতে হবে ১৯৭০ এ প্রকাশিত ' কচটথপর ' কে। পত্রিকার প্রচ্ছদে থাকত মডার্নিস্ট শিল্প, যেখানে প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে অধিমূলম, আর. বি. ভাস্করন, দক্ষিণামূর্তি, অচূতন কুদাল্লুর এবং পি. কৃষ্ণমূর্তি রেখে গিয়েছেন তাঁদের অনন্যতার ছাপ। পঞ্চাশের বা ষাটের দশকে প্রকাশিত কোনো তামিল লিটল ম্যাগাজিনই সাহিত্য ব্যাতীত অপর কোনো শিল্প মাধ্যমের প্রকাশের পথে হাঁটেননি। কিন্তু ' কচটথপর ' ছাড়িয়ে ছিল সাহিত্যের গণ্ডি। পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক রামাকৃষ্ণন তাঁদের পত্রিকার চরিত্র রীতিমতো ' বিপ্লবী ' বলে মনে করতেন। পত্রিকার আত্মপ্রকাশ সংখ্যার সম্পাদকীয়তেই তাঁরা লিখেছেন, ' This is a platform for the angry young men who recent the current state of literature and magazines.'
' মেরেছো কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দেবো না? ' লিটল ম্যাগাজিন থাকবে অথচ থাকবে না গোষ্ঠী - দ্বন্দ্ব, ব্যক্তি কোন্দল, একে অপরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি? তামিল ' লিটল' এ অবশ্য গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব চাগাড় দিয়ে উঠেছিল মতাদর্শের পার্থক্য থেকেই। তামিল 'লিটল' এর প্রথম গোষ্ঠী দ্বন্দ্বটি হয় ' ভানমবড়ি ' বনাম ' প্রেগনাই ' ও ' কচটথপর ' এর মধ্যে। কারণ ' ভানমবড়ি ' যখন কবিতা শৈলীর ক্ষেত্রে জোর দিচ্ছে কনটেন্টে, ফর্মকে ফ্যাক্টর ধরতে নারাজ তখন অপর দুই পত্রিকার মডার্নিস্ট অ্যাপ্রোচ ফর্মকেই গুরুত্ব দেয়। ফলে দ্বন্দ্বের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায় কবিতার কনটেন্ট ও ফর্ম কেন্দ্রিক। এই বিষয়ে দলিত সাহিত্য ও সংস্কৃতি সমালোচক রাজ গৌথমান - এর বক্তব্য ---
" Both groups made the same mistake of treating form and content as separate entities --- for the purists the form was superlative and for the progressives, only revolutionary content mattered as the form was an abstraction and an elite indulgence--- and ultimately failed to explain the relationship between them. "
১৯৮০ র মাঝামাঝি তামিল লিটল ম্যাগাজিন ছড়িয়ে পড়েছে মফস্বল থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। আর ছড়ানোর সাথেই বদলেছে কনটেন্টের চারিত্রিক বৈশিষ্ট। তামিল সমাজে ব্রাহ্মণদের আধিপত্য জন্ম দিয়েছে অব্রাহ্মণ সাহিত্যের, বর্ণবৈষম্য বিষয়ক সমাজ- সংস্কৃতি কেন্দ্রিক বিতর্ক ঢুকেছে পত্রিকার পাতায়, রাজনীতির পরিসরে ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকা মার্ক্সীয় দর্শন জন্ম দিয়েছে নিও - মার্ক্সিজমের, একটা সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে উঁকি দিয়েছে ম্যাজিক রিয়ালিজম থেকে সাহিত্যের পোস্ট মডার্নিটি যার ঠিক পরেই তামিল ' লিটল ' ঢুকছে লাতিন আমেরিকান ' তৃতীয় বিশ্ব ' ও ' কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্য ' চর্চায়। নব্বইয়ের দশক হয়ে উঠছে পুরোপুরি ভাবেই দলিত সাহিত্য কেন্দ্রিক।
আশির দশকে তামিলনাড়ুতে প্রকাশিত হয়েছে বহু তত্ত্ব চর্চার লিটল ম্যাগাজিন যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ' পাড়িগল ', ' মেলাম ', ' মিতচি ', ' বিধিয়াসম ' প্রমুখ পত্রিকা। অনুবাদক তামিলাভন, ব্রহ্মরাজন ও নাগার্জুননের করা পাশ্চাত্য তত্ত্বের অনুবাদ ব্যবহৃত হয়েছে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক তামিল সাহিত্যের বিশ্লেষণে। প্রাচীন যুগের ' সঙ্গম কবিতা ', মধ্য যুগের ' ভক্তি কবিতা ' কিংবা আধুনিক যুগের সুন্দর রামাস্বামীর ম্যাগনাম ওপাস ' সিলা কুরিপুকাল ' এর বিশ্লেষণ হয়েছে পাশ্চাত্যের স্ট্রাকচারালিস্ট ও পোস্ট স্ট্রাকচারালিস্ট তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে। তবে পাশ্চাত্যের সঙ্গে তামিলের মৌলিক পার্থক্য হলো, পশ্চিমের যাবতীয় তত্ত্ব তৈরী হয় অ্যাকাডেমিক পরিসরে কিন্তু তামিলে ঘটেছে লিটল ম্যাগাজিনের হাত ধরে। টেক্সট এ 'ক্ষমতা' ও ' মতাদর্শ ' খুঁজে বের করবার অনুসন্ধিৎসা বাধ্য করেছিল তামিল ' লিটল ' সম্পাদকদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির রাজনীতি বিষয়ক বক্তব্য উপস্থাপনে। আর সেটি করতে গিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই গঠিত হয়েছে লিটল ম্যাগাজিনের বিভিন্ন মঞ্চ বা ফোরাম। লিটল ম্যাগাজিন ' পাড়িগল ' কে দেখা যায় এরকমই এক সাংস্কৃতিক ফোরাম ' ইলাক্কু ' গঠন করতে যে মঞ্চে যুক্ত হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন ' নিগাজ ', ' পরিমানম ', ' আক ', ' ভিজিগল '। যুক্ত হয়েছে নাট্যদল ' পরীক্ষা ' ও ' বেদী ' এবং প্রকাশক ' ভাইগাই ' ও ' ক্রি- য়া '। সাংস্কৃতিক রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে গিয়েই তাঁদের নিতে হয়ে ছিল এলিটিজম ও পপুলিজমের এক মধ্যবর্তী অবস্থান যেখানে তাঁরা বিরোধিতা করেছেন লিটল ম্যাগাজিনীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের। এই কারণেই বোধ হয় ' পাড়িগল ' পত্রিকার প্রকাশিত কনটেন্টে দেখা যায় পপুলার কালচার বিষয়ক কিছু সিরিয়াস লেখাপত্তর।
নব্বইয়ের দশক। ভেঙে পড়েছে সোভিয়েত। ভাঙছে রাশিয়ান ভদকায় আচ্ছন্ন সাধারণ মানুষের শীতঘুম। তাঁরা প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন সোভিয়েত তত্ত্ব ও দর্শনকে। এরকমই এক প্রেক্ষাপটে কবি ডি. রবিকুমার ও পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক এ. মার্ক্স যৌথ ভাবে শুরু করলেন তাঁদের লিটল ম্যাগাজিন ' নিরাপ্পিরিকাই ', আত্মপ্রকাশ ১৯৯০ তে। এঁদের কাজটা ছিল বাকি তত্ত্বচর্চা বিষয়ক ' লিটল' এর থেকে একটু আলাদা। তাঁরা বিয়ে দিলেন ছেলে ' তত্ত্ব ' এর সঙ্গে মেয়ে ' প্রয়োগ ' এর। অর্থাৎ তাঁদের পাতায় যেমন বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ স্থান পেল, সেই প্রবন্ধের ভিত্তি হয়ে উঠল তামিল নাড়ুর প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সশরীরে করা ক্ষেত্র সমীক্ষা। তাঁরা গর্জে উঠেছেন দলিতের প্রতি অত্যাচারের বিরুদ্ধে, কলম ধরেছেন শ্রী রঙ্গম মন্দিরে তথাকথিত নিম্ন বর্ণের প্রবেশাধিকারের সপক্ষে। বর্ণ বৈষম্য, জাতীয়তাবাদ, নারীবাদ, ভাষা ও নাস্তিকতাই ছিল ' নিরাপ্পিরিকাই ' এর আলোচনার বিষয়। তাঁরা প্রকাশ করেছিলেন দলিত সাহিত্য ও আফ্রিকান সাহিত্য বিষয়ক দুটি বিশেষ সংখ্যাও। জানা যায় এই পত্রিকার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে কাজ করেছে দু' ই সম্পাদকের ক্রমবর্ধমান ব্যক্তি সম্পর্কের অবনতি।
পরিশেষে এটুকুই বলবার, তামিল ' লিটল ' শুরু থেকেই দেখে এসেছে তার চারিত্রিক বৈশিষ্টের বদল যা তার সামাজিক প্রেক্ষাপটে ছিল অপরিহার্য। পঞ্চাশের দশকে আভাঁ গার্দ, ষাটের দশকে মডার্নিজম, সত্তর ও আশির দশকে বামপন্থা ও নব্বইয়ের দশকে দলিত সাহিত্যের উত্থানের মধ্যে দিয়ে যে চারিত্রিক বাঁক বদলের সাক্ষী থেকেছে, ক্রমাগত এনেছে তামিল সাহিত্যে নিত্য নতুন তত্ত্ব তা ইতিহাস আকারে লিপিবদ্ধ হওয়ার দাবি রাখে।
প্রথমেই জানিয়ে রাখা ভালো, তামিল ভাষা আমি পড়তে, লিখতে, বলতে কোনোটাই পারি না। এমনকি শুনলেও বুঝি না। তবে ছাত্র জীবনে বহু তামিল বন্ধু হয়েছে আমার। তারা তাদের মাতৃভাষা ছাড়াও ইংরেজিতেই এতটাই দক্ষ ছিল যে আমরা আমাদের মনের ভাব খুব অনায়াসেই ইংরেজিতে আদান প্রদান করেছি। দক্ষিণ ভারতীয় ভাষাগুলির মধ্যে আমার দৌড় ওই কান্নাড়াতে কাজ চালানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমার আগ্রহের বিষয় যেহেতু লিটল ম্যাগাজিন তাই ইংরেজিতে যেটুকু তথ্য উপলব্ধ তার ওপরে নির্ভর করেই এগোতে চাইছি বাংলা ভাষার তামিল 'লিটল' চর্চা।
তামিলের প্রখ্যাত ছোটো গল্পকার পুদুমাইপ্পিথান শুরু করতে চেয়েছিলেন ' শোধনী ' নামের এক লিটল ম্যাগাজিন। এর মাধ্যমে তিনি ধরতে চাইছিলেন দু' টো বিষয়। এক, তাঁর পত্রিকা হয়ে উঠবে শিল্প ও সাহিত্যের পরীক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম এবং অবশ্যই সাহিত্যের বাণিজ্যিকরণের বিরোধিতা। এটা জেনেই যে সেই সময়ে তামিল ভাষায় ব্যক্তি উদ্যোগে প্রকাশিত পত্রিকার অর্থনীতি খুব একটা সুবিধেজনক ছিল না। শেষ পর্যন্ত তাঁর এই উদ্যোগ বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছিল কিনা তা জানা যায় না। পাশ্চাত্যের মতোই তামিল 'লিটল' এর জন্ম মডার্নিজম বা আধুনিকতাকে কেন্দ্র করে। তামিল লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সূত্রপাত পঞ্চাশের দশকে যখন তামিল কবিতা, ছোটো গল্প ও সাহিত্য সমালোচনায় মডার্নিজম হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ। সত্তরের দশক পর্যন্ত তামিল 'লিটল' এ মডার্নিজমের দাপট চললেও এই দশকেই তামিল জনমানসে ঘটে রাজনৈতিক পালাবদল। এই সময়ে যখন মানুষ ঝুঁকছেন মার্ক্সীয় তত্ত্ব চিন্তায়, তখন স্বাভাবিক ভাবেই শিল্প ও সাহিত্যে, সর্বপরি লিটল ম্যাগাজিনে পড়েছে তার ছাপ। আবার নব্বইয়ের দশকের 'লিটল' ছিল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শের এক অদ্ভূত মিশ্রণ। তখন বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন তত্ত্ব তাঁরা চর্চা করে প্রয়োগ করছেন তামিল লিটল ম্যাগাজিনে।
তামিল লিটল ম্যাগের ইতিহাস চর্চাকারী ভাল্লিকান্নন, তাঁর তামিল ' লিটল ' বিষয়ক বই Tamizhil Sirupathirikaigal এ বেশ কিছু পত্রিকার হদিস দিয়েছেন যা ঠিক ' লিটল ' না হলেও ছিল সাময়িক পত্র। উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে সুব্রমণিয়া ভারতী সম্পাদিত দুটি জাতীয়তাবাদী পত্রিকা ' ইন্ধিয়া ' ও ' চক্রবর্তীনী '।
![]() |
| ইন্ধিয়া তে প্রকাশিত কার্টুন |
![]() |
| চক্রবর্তীনী |
তামিল ঔপন্যাসিক বি.আর. রাজম আইয়ার ও এ. মাধবৈয়া সম্পাদিত ' বিবেক চিন্তামণি ' ও ' পঞ্চমির্থম ' কিংবা ভারতীর সমসাময়িক ঔপন্যাসিক ভি ভি এস আইয়ার সম্পাদিত ' বালাভারতী '। এগুলিকেই ধরা হয় তামিল লিটল ম্যাগাজিনের পূর্বসূরী হিসেবে।
![]() |
| বালাভারতী |
এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ছিল ' মানিকোড়ি 'যেটি ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। সাপ্তাহিক রাজনীতির কাগজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে শুরুর দিকে মহাত্মা গান্ধীর মতবাদকে প্রচার করলেও পরবর্তীতে হয়ে ওঠে এক বিশুদ্ধ সাহিত্যপত্র। সম্পাদক বি. এস. রামাইয়ার সম্পাদনায় যার ছোটো গল্পের বিভাগটি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল পাঠকের। ' মানিকোড়ি' তে প্রকাশিত হয়েছে তামিল সাহিত্যের খ্যাতনামা লেখক পুদুমাইপ্পিথান, মৌনি, কা. না. সুব্রমনিয়াম ও সি. এস. চেল্লাপ্পার বহু লেখা। পরবর্তীতে যেখানে তামিল লিটল সম্পাদকেরা ' সিরিয়াস সাহিত্যের ' ওপরে জোর দিয়েছেন, সেই ' সিরিয়াস সাহিত্য' ই বি. এস. রামাইয়ার সম্পাদনায় ১৯৩৫ - ৩৯ সময়কালে প্রকাশিত হয়েছে 'মানিকোড়ি' তে। এই ' সিরিয়াস সাহিত্যে' উদ্বুদ্ধ হয়েছেন ' মানিকোড়ি ' পরবর্তী বহু পত্রিকা সম্পাদক। যে কারণে কিছু সংখ্যক তামিল স্কলার ' মানিকোড়ি' কেই তামিল ভাষার প্রথম লিটল ম্যাগাজিন বলে দাবি করেছেন। অবশ্য বিশিষ্ট তামিল লেখক ভি. আরাসুর মত সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর মতে, ' যেহেতু পুদুমাইপ্পিথান, না. পিচামূর্তি কিংবা কু.পা. রাজাগোপালনের লেখা মানিকোড়িতে প্রকাশিত হয়েছে তাই এটিকে ' লিটল ' বলতে হবে? এই পত্রিকার কাজ ছিল একটি আলাদা রকমের বাণিজ্যিক কাগজের মতো, যার না ছিল কোনো নির্দিষ্ট দর্শন, না কোনো সামাজিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা। মানিকোড়ি ছিল ব্রিটিশ বিরোধি ও pro- mirasidars. এটা একটা ঐতিহাসিক ভুল হবে যদি মানিকোড়িকে তামিল 'লিটল' এর পূর্বসূরি কিংবা লিটল ম্যাগাজিন শ্রেণিভুক্ত করা হয় কারণ এই পত্রিকায় সেই বেসিক ইনগ্রেডিয়েন্টগুলোই নেই যা একটি পত্রিকাকে ' লিটল ম্যাগাজিন ' এ রূপান্তরিত করে। '
এখন 'মানিকোড়ি' সম্পূর্ণ ভাবেই তামিল বাণিজ্যিক ' আনন্দ ভিকাতন' এর বিরোধি হলেও এখানে প্রকাশিত হয়েছে এরকম কিছু লেখক যাঁদের বাণিজ্যিক সাহিত্য মহলে যথেষ্ট নাম ডাক ছিল। ফলে লিটল কর্মীদের এলিটীয় মনোভাব কি কোনো ভাবে 'মানিকোড়ি'র লিটল ম্যাগাজিন স্বীকৃতির বিরোধি হয়ে পড়ছে? কারণ, আমরা জানি একটি পত্রিকা ' লিটল ' হয়ে ওঠে তার প্রকাশিত কনটেন্টের চারিত্রিক বৈশিষ্টে। অবশ্য তামিল লিটারারি হিস্টোরিয়ান এ. আর. ভেঙ্কটচলপতির মতে, ' The sharp distinction between mass circulated commercial magazine and self- consciously ' serious ' little magazine did not happen until the beginning of the 1960s. '
![]() |
| মানিকোড়ি |
যদি ভেঙ্কটচলপতির বক্তব্যকে মান্যতা দেওয়া হয় তবে তামিল ভাষার প্রথম লিটল ম্যাগাজিনের আত্মপ্রকাশ ১৯৫৯ এ, সি. এস. চেল্লাপ্পার সম্পাদনায় 'এজুথু' প্রকাশের মাধ্যমে। সম্পাদক চেল্লাপ্পা চেয়েছিলেন পরিবর্তন ঘটুক পাঠকের স্বাদে। তিনি নিয়ে আসতে চেয়েছেন ' পুধু কবিধাই ' নামের এক নতুন কবিতার ফর্ম ও একই সঙ্গে মডার্নিস্ট সমালোচনা। তিনি তামিল কবিতার গতানুগতিক কাব্যময়তা ভেঙে কবিতায় আনতে চেয়েছিলেন স্বল্প শব্দের প্রয়োগ, নির্দিষ্ট ডিকশন ও বর্ণনা প্রবণতায় সীমাবদ্ধতা। যে ফর্মের বিরোধিতা যেমন সমসাময়িক বহু কবিই করেছেন, করেছেন মার্ক্সীয় দর্শনে উদ্বুদ্ধ লেখকেরাও। সম্পাদক চেল্লাপ্পা বুঝেছিলেন, তাঁর এই ফর্মটিকে যদি জনমানসে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হয়, তাহলে গড়তে হবে শক্তিশালী তত্ত্বের ভিত্তি। তিনি উপলব্ধি করেন, তামিলনাড়ুর বেশির ভাগ সাহিত্য পাঠকই নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির ফলে এতদিন যে সাহিত্য সমালোচনার ভঙ্গিমায় তাঁরা অভ্যস্ত ছিলেন তা নিছক মেলোড্রামাটিক। চেল্লাপ্পাকে অনুপ্রাণিত করলেন কা. না. সুব্রমনিয়াম এক আধুনিক সমালোচনার ফর্মের উৎপত্তিতে। ১৯৫০ এর দশকে চেন্নাইতে গড়ে উঠেছে আমেরিকান ও ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি। চেল্লাপ্পাও নিয়মিত যেতে শুরু করলেন এই লাইব্রেরিতে, বুঝতে চাইলেন সাহিত্য সমালোচনার আন্তর্জাতিক রূপ। উইলিয়াম এম্পসন, জন ক্রো র্যানসম, আই. এ. রিচার্ডস ও এফ. আর. লিয়েভিসের মতো বলিষ্ঠ সাহিত্য সমালোচকদের লেখা পড়ে নিজের মনেই জন্ম দিলেন সাহিত্য সমালোচনার নতুন ফর্ম, নাম দিলেন ' প্র্যাক্টিকাল ক্রিটিসিজম ' যা তাঁর মতে হবে পূর্বসূরীদের লেখা সমালোচনার ভঙ্গিমা থেকে একেবারেই আলাদা। যদিও তখন তামিল সাহিত্য সমালোচনা কিছুটা রাশিয়ান / মার্ক্সিস্ট ঘরানার ছিল, চেল্লাপ্পা ঝুঁকলেন অ্যাঙ্গলো আমেরিকান নন্দনতত্ত্বের দিকে। তামিল সাহিত্যিক আরাসু, চেল্লাপ্পার আমেরিকান তত্ত্ব- প্রীতির পেছনে তাঁর গান্ধিবাদী মতাদর্শকে দেখাতে চেয়েছেন। বলতে চেয়েছেন, গান্ধিবাদীদের কাছে বামপন্থা একটু উগ্র ঠেকে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, একজন লেখক বা সম্পাদকের কোনো একটি নির্দিষ্ট দর্শনের প্রতি দুর্বলতা সব সময় তাঁর ব্যক্তিদর্শন বা রাজনৈতিক দর্শন নির্ভরশীল নাও হতে পারে। ফলে আরাসু তাঁর পর্যবেক্ষণে কতটা ঠিক সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এজুথুতে প্রকাশিত হয়েছে কবিতা ও কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ। যেমন লেখক পিচামূর্তির ' বাসনা কবিধাই ' ( গদ্য কবিতা) কিংবা কা. না. সুব্রমনিয়ামের ' ইলাকিয়াথিল বিষয়ামাম উরুভামন ' ( সাহিত্যের কন্টেন্ট ও ফর্ম) যেখানে তাঁরা আধুনিক কবিতা শৈলীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। কবিতা বিভাগে দেখা যাচ্ছে না. পিচামূর্তি, সি. মণি, মায়ান, চিট্টি, নকুলন, প্রমিল শিবরাম, সুন্দর রামাস্বামী, এস. ভৈথিশ্বরন প্রমুখ কবিকে। এজুথুতে প্রকাশিত হয়েছিল তামিল স্কলার আর. দেশিকানের লেখা ধারাবাহিক তত্ত্বচর্চা বিষয়ক গদ্য ' কবিধাইকলাই ' ( কবিতার শিল্প)।এই গদ্যে দেশিকান আলোচনা করেছেন প্লেটো থেকে ডাব্লিউ এইচ. আউডেন এর কাব্যতত্ত্ব বা পোয়েটিকস নিয়ে। লিটল ম্যাগ এজুথু প্রথম থেকেই তার পাঠকের বিষয়ে ছিল খুঁতখুঁতে। তাঁরা পত্রিকাটিকে কোনো বইয়ের দোকানে বিক্রি করতে দিতেন না। তাঁদের কাছে পাঠক বলতে শুধু তাঁরাই যাঁরা রীতিমতো দপ্তরে এসে দিয়ে যাবেন গ্রাহক চাঁদা। দু' হাজার কপির বেশি ছাপা হবে না কোনো সংখ্যাই। বাস্তবে তাঁদের পাঠক সংখ্যা চারশোর মাত্রাও অতিক্রম করেনি। তবে তামিল পরিমণ্ডলে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ থেকে নির্দিষ্ট চাহিদা সম্পন্ন পাঠকের জন্যে পত্রিকা প্রকাশের ট্রেন্ড শুরু হয় সম্পাদক চেল্লাপ্পার হাত ধরেই।
এজুথুতে প্রকাশিত হয়েছে কবিতা ও কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ। যেমন লেখক পিচামূর্তির ' বাসনা কবিধাই ' ( গদ্য কবিতা) কিংবা কা. না. সুব্রমনিয়ামের ' ইলাকিয়াথিল বিষয়ামাম উরুভামন ' ( সাহিত্যের কন্টেন্ট ও ফর্ম) যেখানে তাঁরা আধুনিক কবিতা শৈলীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। কবিতা বিভাগে দেখা যাচ্ছে না. পিচামূর্তি, সি. মণি, মায়ান, চিট্টি, নকুলন, প্রমিল শিবরাম, সুন্দর রামাস্বামী, এস. ভৈথিশ্বরন প্রমুখ কবিকে। এজুথুতে প্রকাশিত হয়েছিল তামিল স্কলার আর. দেশিকানের লেখা ধারাবাহিক তত্ত্বচর্চা বিষয়ক গদ্য ' কবিধাইকলাই ' ( কবিতার শিল্প)।এই গদ্যে দেশিকান আলোচনা করেছেন প্লেটো থেকে ডাব্লিউ এইচ. আউডেন এর কাব্যতত্ত্ব বা পোয়েটিকস নিয়ে। লিটল ম্যাগ এজুথু প্রথম থেকেই তার পাঠকের বিষয়ে ছিল খুঁতখুঁতে। তাঁরা পত্রিকাটিকে কোনো বইয়ের দোকানে বিক্রি করতে দিতেন না। তাঁদের কাছে পাঠক বলতে শুধু তাঁরাই যাঁরা রীতিমতো দপ্তরে এসে দিয়ে যাবেন গ্রাহক চাঁদা। দু' হাজার কপির বেশি ছাপা হবে না কোনো সংখ্যাই। বাস্তবে তাঁদের পাঠক সংখ্যা চারশোর মাত্রাও অতিক্রম করেনি। তবে তামিল পরিমণ্ডলে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ থেকে নির্দিষ্ট চাহিদা সম্পন্ন পাঠকের জন্যে পত্রিকা প্রকাশের ট্রেন্ড শুরু হয় সম্পাদক চেল্লাপ্পার হাত ধরেই।
![]() |
| এজুথু |
ষাটের দশকের শুরুর দিকে, নির্দিষ্ট করে বললে ১৯৬৩ থেকে '৬৫ -র মধ্যে কা. না. সুব্রমনিয়ামের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় লিটল ম্যাগাজিন ' ইলাক্কিয়া ভট্টম ' যাঁরা নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ করেছিলেন অনুবাদ ও সমালোচনায়। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল আভাঁ গার্দে উদ্বুদ্ধ পাশ্চাত্য 'লিটল' এ প্রকাশিত পরীক্ষামূলক কবিতার তামিল অনুবাদ পাঠকের সামনে তুলে ধরা। এই সময়ের বেশির ভাগ ' লিটল' ই যখন হয়ে উঠছে কবিতা কেন্দ্রিক তখন লিটল ম্যাগাজিন ' নাড়াই ' ( ১৯৬৮-৭০) নিয়ে আনলেন তাঁদের বিষয়ে বৈচিত্র। প্রকাশিত হলো অ্যাবসার্ডিস্ট নাটক ও বিভিন্ন চারুকলা শিল্পীর করা স্কেচ ও লাইন ড্রয়িং। যদি তামিল লিটল ম্যাগাজিনে তামিল শিল্প ও সাহিত্যের সর্বাঙ্গীণ চিত্রকে দেখতে হয় তাহলে খুলতে হবে ১৯৭০ এ প্রকাশিত ' কচটথপর ' কে। পত্রিকার প্রচ্ছদে থাকত মডার্নিস্ট শিল্প, যেখানে প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে অধিমূলম, আর. বি. ভাস্করন, দক্ষিণামূর্তি, অচূতন কুদাল্লুর এবং পি. কৃষ্ণমূর্তি রেখে গিয়েছেন তাঁদের অনন্যতার ছাপ। পঞ্চাশের বা ষাটের দশকে প্রকাশিত কোনো তামিল লিটল ম্যাগাজিনই সাহিত্য ব্যাতীত অপর কোনো শিল্প মাধ্যমের প্রকাশের পথে হাঁটেননি। কিন্তু ' কচটথপর ' ছাড়িয়ে ছিল সাহিত্যের গণ্ডি। পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক রামাকৃষ্ণন তাঁদের পত্রিকার চরিত্র রীতিমতো ' বিপ্লবী ' বলে মনে করতেন। পত্রিকার আত্মপ্রকাশ সংখ্যার সম্পাদকীয়তেই তাঁরা লিখেছেন, ' This is a platform for the angry young men who recent the current state of literature and magazines.'
![]() |
| ' কচটথপর ' এর তিনটি প্রচ্ছদ |
এই সময়ে পঞ্চাশ থেকে ষাটের দশকের শেষ পর্যন্ত যে তামিল লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে, তাঁরা কেউ রাজনীতি বা সামাজিক বিষয় কেন্দ্রিক লেখা প্রকাশে আগ্রহ দেখাননি । কারণ এই সময়ের বেশিরভাগ সম্পাদকেরাই মনে করেছেন তাঁদের পত্রিকা হবে বিশুদ্ধ সাহিত্য কেন্দ্রিক আর সাহিত্য নিজেই কি আত্মনির্ভর নয়? আবার তাঁরা যে সম্পূর্ণ ভাবেই অ্যাপলিটিকাল ছিলেন তা নয়। তাঁদের বিদ্রোহ বা বিরুদ্ধতা তখন তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ। ( দ্রাবিড় আন্দোলন ছিল তামিল ব্রাহ্মণদের আন্দোলন যাঁরা সমাজের প্রতিটি স্তরে ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করাতে ছিলেন সদা জাগ্রত! ফলে এই আন্দোলন যে তামিল সমাজ ও সাহিত্য জগতেও বৈষম্য সৃষ্টি করেছিল, তা বলবার অপেক্ষা রাখে না। দ্রাবিড় আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে দু' শোরও বেশি সাময়িকী! ) তবে সত্তরের দশকে যখন ' কচটথপর ' আত্মপ্রকাশ করছে তখন দ্রাবিড় আন্দোলনকে প্রায় অস্তমিতই বলা চলে।
তামিল সাহিত্যে সত্তর ও আশির দশক হয়ে দাঁড়িয়েছে বামপন্থী বুদ্ধিবৃত্তি ও দর্শন চর্চার দশক। সত্তরের দশকে যে সমস্ত বামপন্থী লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে সেগুলিকে মোট দু'টি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। প্রথমটি, সরাসরি পার্টির মুখপত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা পত্রিকা এবং দ্বিতীয়টি, স্বাধীনভাবে কোনো বামমনস্ক ব্যক্তির উদ্যোগে প্রকাশিত পত্রিকা। লেখার বিষয় দেশ হোক, সমাজ হোক বা নন্দনতত্ত্ব প্রথম ক্যাটেগোরির পত্রিকাতে খুব স্বাভাবিক ভাবেই ধরা পড়েছে সোভিয়েত রাশিয়া থেকে অনুপ্রানিত ধ্যান-ধারনা। পার্টির সরাসরি নজরদারিতে প্রকাশিত তামিল লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ' থামারাই ', ' সেম্মালার ' ও ' সিগারাম ' নামের তিনটি কাগজ যার প্রকাশক ছিলেন তামিলনাড়ুর সিপিআই(এম) পার্টি। এই পত্রিকাগুলিতে যেমন স্থান পেয়েছে বিপ্লবী কবিতা তেমনই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছে পার্টি ক্যাডারদের লেখা উপন্যাস। ছাপা হয়েছে ধ্রুপদী তামিল সাহিত্যের বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ আর মূল পদ্ধতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল মার্ক্সীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সাহিত্যের কাটাছেঁড়া। তবে সৃজনশীল সাহিত্য বা পরীক্ষামূলক লেখালেখি বলতে আমরা যা বুঝি তা অনেক বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হয়েছে দ্বিতীয় ক্যাটেগোরিতে, অর্থাৎ পার্টির নথিভুক্ত সদস্য নন অথচ বামপন্থায় উদ্বুদ্ধ কোনো সম্পাদকের সম্পাদনায়। সেখানে ঘটতো মজাদার কাণ্ড। এক বামপন্থী সম্পাদক এস. এন. নাগারাজন তাঁর পত্রিকা ' পুথিয়া থালাইমুরাই '( ১৯৬৮-১৯৭০) তে মার্ক্সীয় নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে মেশালেন ভারতীয় আধাত্মিক ফ্লেভার যা ছিল তামিল সিপিআই(এম) এর একেবারেই নাপসন্দ! যদিও ১৯৭৮ এ প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন 'পরিমানম ' এ মার্ক্সীয় চিন্তক কোভাই ননী, নাগারাজনের সঙ্গে সহমত হয়ে শুরু করলেন কিছু পরীক্ষামূলক লেখা যার বিষয় তামিল ও ভারতীয় দর্শন, ধর্ম ও লোকসাহিত্যে মার্ক্সিজমের প্রভাব। যদিও এই ধরনের পরীক্ষা- নিরীক্ষায় অপর বামপন্থী চিন্তক ও লোকসাহিত্য গবেষক না. ভানামামালাই কোনো দিনই হাঁটেননি। ভানামামালাই তাঁর সম্পাদিত লোকসাহিত্য বিষয়ক লিটল ম্যাগাজিন ' আরাইচি' ( ১৯৬৯) তে ছেপেছেন আঞ্চলিক লোক -সংগীত। একই সঙ্গে ভাষাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, দর্শন, সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাসের নিরিখে বিশ্লেষণ করেছেন তামিল লোক সংগীত, লোকসাহিত্য ও লোকাচারকে।
লিটল ম্যাগ ' ভানমবড়ি ' কিংবা ' প্রেগনাই ' কোনো দিনই তাঁদের প্রকাশিত কনটেন্টকে মার্ক্সীয় দর্শনচ্যূত হতে দেননি। ' প্রেগনাই ' এর আত্মপ্রকাশ একটি বিশুদ্ধ সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে হলেও এক বছরের মাথায় তার কনটেন্টে ফুটে ওঠে বামপন্থার ছোঁয়া। তাঁরা প্রকাশ করতে শুরু করেন সামাজ বিজ্ঞান, সিনেমা ও মডার্ন আর্ট বিষয়ক লেখাপত্তর। কোয়েম্বাটোর থেকে প্রকাশিত ' ভানমবড়ি ' অবশ্য থেকে গিয়েছে কবিতা প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ' ভানমবড়ি ' গোষ্ঠী মনে করতেন, কবিতায় থাকবে সমাজ বাস্তবতা। তাই ফর্ম নয়, কবিতার কনটেন্টই তাঁদের কাছে মুখ্য। তাঁরা লিটল ম্যাগ ' এজুথু' র দেখানো ' পুধু কবিধাই ' ফর্মকে নস্যাৎ করেছেন, গড়ে তুলেছেন তাঁদের কবিতা প্রকাশের নিজস্ব এজেন্ডা।
লিটল ম্যাগ ' ভানমবড়ি ' কিংবা ' প্রেগনাই ' কোনো দিনই তাঁদের প্রকাশিত কনটেন্টকে মার্ক্সীয় দর্শনচ্যূত হতে দেননি। ' প্রেগনাই ' এর আত্মপ্রকাশ একটি বিশুদ্ধ সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে হলেও এক বছরের মাথায় তার কনটেন্টে ফুটে ওঠে বামপন্থার ছোঁয়া। তাঁরা প্রকাশ করতে শুরু করেন সামাজ বিজ্ঞান, সিনেমা ও মডার্ন আর্ট বিষয়ক লেখাপত্তর। কোয়েম্বাটোর থেকে প্রকাশিত ' ভানমবড়ি ' অবশ্য থেকে গিয়েছে কবিতা প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ' ভানমবড়ি ' গোষ্ঠী মনে করতেন, কবিতায় থাকবে সমাজ বাস্তবতা। তাই ফর্ম নয়, কবিতার কনটেন্টই তাঁদের কাছে মুখ্য। তাঁরা লিটল ম্যাগ ' এজুথু' র দেখানো ' পুধু কবিধাই ' ফর্মকে নস্যাৎ করেছেন, গড়ে তুলেছেন তাঁদের কবিতা প্রকাশের নিজস্ব এজেন্ডা।
' মেরেছো কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দেবো না? ' লিটল ম্যাগাজিন থাকবে অথচ থাকবে না গোষ্ঠী - দ্বন্দ্ব, ব্যক্তি কোন্দল, একে অপরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি? তামিল ' লিটল' এ অবশ্য গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব চাগাড় দিয়ে উঠেছিল মতাদর্শের পার্থক্য থেকেই। তামিল 'লিটল' এর প্রথম গোষ্ঠী দ্বন্দ্বটি হয় ' ভানমবড়ি ' বনাম ' প্রেগনাই ' ও ' কচটথপর ' এর মধ্যে। কারণ ' ভানমবড়ি ' যখন কবিতা শৈলীর ক্ষেত্রে জোর দিচ্ছে কনটেন্টে, ফর্মকে ফ্যাক্টর ধরতে নারাজ তখন অপর দুই পত্রিকার মডার্নিস্ট অ্যাপ্রোচ ফর্মকেই গুরুত্ব দেয়। ফলে দ্বন্দ্বের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায় কবিতার কনটেন্ট ও ফর্ম কেন্দ্রিক। এই বিষয়ে দলিত সাহিত্য ও সংস্কৃতি সমালোচক রাজ গৌথমান - এর বক্তব্য ---
" Both groups made the same mistake of treating form and content as separate entities --- for the purists the form was superlative and for the progressives, only revolutionary content mattered as the form was an abstraction and an elite indulgence--- and ultimately failed to explain the relationship between them. "
১৯৮০ র মাঝামাঝি তামিল লিটল ম্যাগাজিন ছড়িয়ে পড়েছে মফস্বল থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। আর ছড়ানোর সাথেই বদলেছে কনটেন্টের চারিত্রিক বৈশিষ্ট। তামিল সমাজে ব্রাহ্মণদের আধিপত্য জন্ম দিয়েছে অব্রাহ্মণ সাহিত্যের, বর্ণবৈষম্য বিষয়ক সমাজ- সংস্কৃতি কেন্দ্রিক বিতর্ক ঢুকেছে পত্রিকার পাতায়, রাজনীতির পরিসরে ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকা মার্ক্সীয় দর্শন জন্ম দিয়েছে নিও - মার্ক্সিজমের, একটা সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে উঁকি দিয়েছে ম্যাজিক রিয়ালিজম থেকে সাহিত্যের পোস্ট মডার্নিটি যার ঠিক পরেই তামিল ' লিটল ' ঢুকছে লাতিন আমেরিকান ' তৃতীয় বিশ্ব ' ও ' কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্য ' চর্চায়। নব্বইয়ের দশক হয়ে উঠছে পুরোপুরি ভাবেই দলিত সাহিত্য কেন্দ্রিক।
আশির দশকে তামিলনাড়ুতে প্রকাশিত হয়েছে বহু তত্ত্ব চর্চার লিটল ম্যাগাজিন যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ' পাড়িগল ', ' মেলাম ', ' মিতচি ', ' বিধিয়াসম ' প্রমুখ পত্রিকা। অনুবাদক তামিলাভন, ব্রহ্মরাজন ও নাগার্জুননের করা পাশ্চাত্য তত্ত্বের অনুবাদ ব্যবহৃত হয়েছে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক তামিল সাহিত্যের বিশ্লেষণে। প্রাচীন যুগের ' সঙ্গম কবিতা ', মধ্য যুগের ' ভক্তি কবিতা ' কিংবা আধুনিক যুগের সুন্দর রামাস্বামীর ম্যাগনাম ওপাস ' সিলা কুরিপুকাল ' এর বিশ্লেষণ হয়েছে পাশ্চাত্যের স্ট্রাকচারালিস্ট ও পোস্ট স্ট্রাকচারালিস্ট তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে। তবে পাশ্চাত্যের সঙ্গে তামিলের মৌলিক পার্থক্য হলো, পশ্চিমের যাবতীয় তত্ত্ব তৈরী হয় অ্যাকাডেমিক পরিসরে কিন্তু তামিলে ঘটেছে লিটল ম্যাগাজিনের হাত ধরে। টেক্সট এ 'ক্ষমতা' ও ' মতাদর্শ ' খুঁজে বের করবার অনুসন্ধিৎসা বাধ্য করেছিল তামিল ' লিটল ' সম্পাদকদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির রাজনীতি বিষয়ক বক্তব্য উপস্থাপনে। আর সেটি করতে গিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই গঠিত হয়েছে লিটল ম্যাগাজিনের বিভিন্ন মঞ্চ বা ফোরাম। লিটল ম্যাগাজিন ' পাড়িগল ' কে দেখা যায় এরকমই এক সাংস্কৃতিক ফোরাম ' ইলাক্কু ' গঠন করতে যে মঞ্চে যুক্ত হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন ' নিগাজ ', ' পরিমানম ', ' আক ', ' ভিজিগল '। যুক্ত হয়েছে নাট্যদল ' পরীক্ষা ' ও ' বেদী ' এবং প্রকাশক ' ভাইগাই ' ও ' ক্রি- য়া '। সাংস্কৃতিক রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে গিয়েই তাঁদের নিতে হয়ে ছিল এলিটিজম ও পপুলিজমের এক মধ্যবর্তী অবস্থান যেখানে তাঁরা বিরোধিতা করেছেন লিটল ম্যাগাজিনীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের। এই কারণেই বোধ হয় ' পাড়িগল ' পত্রিকার প্রকাশিত কনটেন্টে দেখা যায় পপুলার কালচার বিষয়ক কিছু সিরিয়াস লেখাপত্তর।
![]() |
| মিতচি-র চতুর্থ সংখ্যার প্রচ্ছদ |
নব্বইয়ের দশক। ভেঙে পড়েছে সোভিয়েত। ভাঙছে রাশিয়ান ভদকায় আচ্ছন্ন সাধারণ মানুষের শীতঘুম। তাঁরা প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন সোভিয়েত তত্ত্ব ও দর্শনকে। এরকমই এক প্রেক্ষাপটে কবি ডি. রবিকুমার ও পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক এ. মার্ক্স যৌথ ভাবে শুরু করলেন তাঁদের লিটল ম্যাগাজিন ' নিরাপ্পিরিকাই ', আত্মপ্রকাশ ১৯৯০ তে। এঁদের কাজটা ছিল বাকি তত্ত্বচর্চা বিষয়ক ' লিটল' এর থেকে একটু আলাদা। তাঁরা বিয়ে দিলেন ছেলে ' তত্ত্ব ' এর সঙ্গে মেয়ে ' প্রয়োগ ' এর। অর্থাৎ তাঁদের পাতায় যেমন বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ স্থান পেল, সেই প্রবন্ধের ভিত্তি হয়ে উঠল তামিল নাড়ুর প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সশরীরে করা ক্ষেত্র সমীক্ষা। তাঁরা গর্জে উঠেছেন দলিতের প্রতি অত্যাচারের বিরুদ্ধে, কলম ধরেছেন শ্রী রঙ্গম মন্দিরে তথাকথিত নিম্ন বর্ণের প্রবেশাধিকারের সপক্ষে। বর্ণ বৈষম্য, জাতীয়তাবাদ, নারীবাদ, ভাষা ও নাস্তিকতাই ছিল ' নিরাপ্পিরিকাই ' এর আলোচনার বিষয়। তাঁরা প্রকাশ করেছিলেন দলিত সাহিত্য ও আফ্রিকান সাহিত্য বিষয়ক দুটি বিশেষ সংখ্যাও। জানা যায় এই পত্রিকার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে কাজ করেছে দু' ই সম্পাদকের ক্রমবর্ধমান ব্যক্তি সম্পর্কের অবনতি।
![]() |
| নিরাপ্পিরিকাই |
পরিশেষে এটুকুই বলবার, তামিল ' লিটল ' শুরু থেকেই দেখে এসেছে তার চারিত্রিক বৈশিষ্টের বদল যা তার সামাজিক প্রেক্ষাপটে ছিল অপরিহার্য। পঞ্চাশের দশকে আভাঁ গার্দ, ষাটের দশকে মডার্নিজম, সত্তর ও আশির দশকে বামপন্থা ও নব্বইয়ের দশকে দলিত সাহিত্যের উত্থানের মধ্যে দিয়ে যে চারিত্রিক বাঁক বদলের সাক্ষী থেকেছে, ক্রমাগত এনেছে তামিল সাহিত্যে নিত্য নতুন তত্ত্ব তা ইতিহাস আকারে লিপিবদ্ধ হওয়ার দাবি রাখে।











.jpg)


Comments
Post a Comment