।। পর্তুগালে মডার্নিজম ।। ( ধারাবাহিক )
পর্তুগালে মডার্নিজমের সলতে পাকানোর পর্বটি শুরু হয়ে গিয়েছিল ১৯১০ সাল থেকেই। ১৯১০ থেকে ১৯২৬ সময়কালে পর্তুগালে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন বা রিভিস্তার হাত ধরে ঘটেছিল শিল্প ও সাহিত্যের পালাবদল, যে কারণে এই সময়কালকে অনেকেই ' প্রথম পর্তুগীজ মডার্নিজম ' এর সময় বলে উল্লেখ করেন। ১৯১০ এ পর্তুগালে যেমন ঘটেছে রাজনৈতিক ও সামাজিক পালাবদল তেমনই প্রকাশিত হয়েছিল দু'টি রিভিস্তা ' আ আগুইয়া ' ও ' লিমিয়া '।
পর্তুগালে মডার্নিজমের প্রারম্ভিক সময়ে যে সমস্ত রিভিস্তা প্রকাশিত হয়েছে তাদের মধ্যে ঘুরে ফিরে একটা নাম বার বার উঠে আসে --- সাহিত্যিক পেসোয়া। যিনি রিভিস্তা ' আ আগুইয়া ' ছেড়ে ১৯১৫ তে তাঁর নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করেন ' অরফিউ ' যেটি হয়ে উঠেছিল পর্তুগীজ মডার্নিজম চর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজ। ১৯২৬ এ হঠাৎ করে স্তিমিত কেন হলো আধুনিকতার দাপট ? স্তিমিত হয়েছিল কারণ এই বছরেই দীর্ঘ ষোলো বছরের গণতান্ত্রিক সরকারের অপদার্থতা ডেকে আনলো একনায়কতন্ত্রী শাসন। মডার্নিজমের দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরু ১৯২৭ থেকে রিভিস্তা ' প্রেসেন্স ' এর আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে। পর্তুগালে আভাঁ গার্দ থেকে মডার্নিজমের উত্থানটিকে বুঝতে গেলে আমাদের জানতে হবে ১৯১০ থেকে ১৯২৬ সময়কালে প্রকাশিত কিছু রিভিস্তার কথা বুঝতে হবে পর্তুগীজ মডার্নিজমে পেসোয়ার ভূমিকাও।
১৯১০। পর্তুগালে গঠিত হলো জনগণের নির্বাচিত সরকার আর একই সঙ্গে অক্টোবরে প্রকাশিত হলো ' চিঠিপত্র, বিজ্ঞান ও শিল্প বিষয়ক মাসিক পত্রিকা ' লিমিয়া, যেটি ১৯১১ র এপ্রিল-মে পর্যন্ত নিয়মিত ভাবেই প্রকাশিত হয়েছে। ( ' লিমিয়া' র সর্বশেষ সংখ্যা যেটি এপ্রিল-মে যুগ্ম সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল, তার প্রচ্ছদে প্রকাশের সাল ছাপা হয় ১৯১২। যদিও টাইটেল পেজে সঠিক ভাবেই এপ্রিল-মে ১৯১১ র উল্লেখ আছে। ) সম্পাদক ক্লডিও বাস্তো (যদিও এটির সম্পাদক হিসেবে সব সময় জোয়া ডা রোচা-র নামই প্রকাশিত হয়েছে) তাঁর পত্রিকায় জোর দিয়েছিলেন ইতিহাস, সাহিত্য ও শিল্পের প্রতি। ' লিমিয়া ' প্রকাশের আগে তিনি যোগাযোগ করেন তাঁর কর্মস্থলের কিছু বন্ধুর সঙ্গে। তাঁরা কেউ ক্লডিওকে নিরাশ করেননি। বন্ধু লিওনার্দো কোইমব্রো, আলভারো পিন্টো ও জাইম কার্তেসো এগিয়ে এসেছিলেন তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে। ( এই আলভারো পিন্টো ও জাইম কার্তেসোর সঙ্গে সম্মিলিত ভাবে পরবর্তীতে ক্লডিও প্রকাশ করেন অপর এক রিভিস্তা, নাম ' নোভা সিলভা '। এখানেও এটির সম্পাদক হিসেবে সব সময় জোয়া ডা রোচা-র নামই প্রকাশিত হয়েছে।)
![]() |
| 'লিমিয়া' র আত্মপ্রকাশ সংখ্যার প্রচ্ছদ |
' লিমিয়া' র শেষ সংখ্যার দাম ছিল ১৬০ রেইস যা তার আগের সংখ্যাগুলোর থেকে অনেকটাই বেশি। ' লিমিয়া' র বাদবাকি সংখ্যাগুলোর দাম হতো ১০০ রেইস করে। যে ধরনের কাগজের কোয়ালিটি ও লে আউটে পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে সেই সময়ের পর্তুগীজ অর্থনীতির কথা মাথায় রেখে দামটাকে গড়পড়তাই বলা চলে। পত্রিকা মাত্র এক বছরের জন্যে প্রকাশিত হলেও সম্পাদক ক্লডিও তাঁর ছাপাখানা বদলেছেন তিন বার। এর থেকে কি আমরা বলতে পারি সম্পাদক ক্লডিও হয় চিন্তিত ছিলেন পত্রিকার বাজেট নিয়ে নয় ছাপার কোয়ালিটি সম্পর্কে ছিলেন বেজায় খুঁতখুঁতে? ' লিমিয়া' র প্রথম দু' টি সংখ্যার বর্ণ সংস্থাপক হিসেবে দেখা যায় ' আন্দ্রে যে. পেরেইরা অ্যান্ড ফো'স ' সংস্থাকে যার অফিস ছিল ভায়ানা দো কাস্তালো অঞ্চলে। এরপর তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ সংখ্যার বর্ণসংস্থাপন করেন পোর্তো অঞ্চলের ' টাইপোগ্রাফি ইউনিভার্সাল '। শেষ তম যুগ্ম সংখ্যার দায়িত্বে আবারও ক্লডিও ফেরেন পেরেইরা সংস্থার কাছেই। ' লিমিয়া' র চতুর্থ সংখ্যার বিক্রি যে খুব ভালোই হয়েছিল এবং আত্মপ্রকাশ সংখ্যা একেবারে নিঃশেষিত তা সম্পাদক নিজেই জানান তাঁর সম্পাদকীয়তে। ফলে মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে কেন বন্ধ হলো 'লিমিয়া' তা বুঝে ওঠা দুষ্কর!
![]() |
| এপ্রিল-মে ১৯১১ তে প্রকাশিত শেষ যুগ্ম সংখ্যার প্রথম পাতা |
দেশ হিসেবে পর্তুগালের আয়োতন খুব একটা বড়ো নয়। তাই একটি পত্রিকার প্রসার জাতীয় স্তরেই হোক অথবা আঞ্চলিক স্তরে, তাঁদের প্রকাশিত লেখার বিষয়বস্তুর বেশির ভাগটাই ছিল পর্তুগীজ ঐতিহ্য, ইতিহাস ও লোকাচার কেন্দ্রিক। যেমন ' লিমিয়ার ' প্রথম সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে আজোরস অঞ্চলের বাসিন্দা গনজালো ভেলহো- কে নিয়ে প্রবন্ধ যার বিষয় হয়ে উঠেছে তাঁর ব্রাগা অঞ্চলের বাড়ি যেটি তৈরি হয়েছে মধ্যযুগীয় পর্তুগীজ স্থাপত্যের অনুকরণে। প্রকাশিত হয়েছে ইতিহাসবিদ ফেলেক্স আলভিস পেরেইরার উত্তর পর্তুগালের দুর্গ-নিবাসী মানুষ বিষয়ক প্রবন্ধ। অর্থাৎ লেখাগুলি কোনো একটি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে তার ভৌগোলিক অবস্থান, স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। সঙ্গে থাকত কবিতা, শিল্পীদের আঁকা ও অলংকরণ। পত্রিকার লেখক তালিকায় উল্লেখযোগ্য কিছু নাম হয়ে উঠেছিলেন কবি জোসে ভালে, ইতিহাসবিদ লুই ডি ফিগুয়েরেদো ডা গুয়েরা, তেইক্সেরিয়া ডি পাস্কোরেস, আফোনসো লোপেজ ভেইরা প্রমুখ।
এক বছরে প্রকাশিত মোট আটটি সংখ্যার মধ্যে সম্পাদক ক্লডিও তাঁর চতুর্থ সংখ্যাটিকে প্রকাশ করেন বিশেষ সংখ্যা, ইতিহাসবিদ সৌসা ভিতাবোর স্মরণ সংখ্যা হিসেবে, যিনি 'লিমিয়া' তে এক সময়ে ফ্লেমিশ চিত্রকর ক্রিস্টফারকে নিয়ে কলম ধরেছিলেন। তৃতীয় সংখ্যাটি কোনো বিশেষ সংখ্যা না হলেও প্রকাশিত হয়েছিল তলস্তয়ের মৃত্যুতে তাঁর প্রতি নিবেদিত দু' টি লেখা। ১৯১০ এর ডিসেম্বরে প্রকাশিত এই সংখ্যায় লিখেছিলেন লিওনার্দো কোইমব্রো, ছিল তলস্তয়কে নিয়ে ন্যাচারালিস্ট তাত্ত্বিক মাগালহায়েস লিমার স্মৃতিচারণ।
' লিমিয়া' র শেষ পৃষ্টায় সম্পাদক রাখতেন ' বিবলিওগ্রাফি ' বিভাগ যেটি পড়লে সমসাময়িক পর্তুগীজ বই ও রিভিস্তা সম্পর্কে আমাদের কিছুটা হলেও ধারনা হতে পারে।' লিমিয়া ' র ষষ্ঠ সংখ্যার ' বিবলিওগ্রাফি ' তে প্রকাশিত হয়েছে প্রকাশিতব্য রিভিস্তা ' ফিগুয়েরা' র প্রথম দু' টি সংখ্যার আলোচনা, যে পত্রিকার প্রকাশ হয়েছিল ১৯১১ থেকে ১৯১৬ র অন্তরবর্তী সময়ে। এই বিভাগেই প্রথম বারের জন্যে ছাপা হয়েছে কিছু চাইনিজ এলিজি যেগুলি রিভিস্তা ' সেনটাউরো ' র দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশের কথা থাকলেও কোনো দিনই প্রকাশিত হয়নি। একটা প্রশ্ন খুব সহজেই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, ' লিমিয়া ' সম্পাদক তো আর অন্তর্যামী নন যে অপর কোনো পত্রিকায় আগামীতে কী প্রকাশ পেতে চলেছে তা আগে ভাগে জেনে যাবেন, যদি না সেই পত্রিকার সম্পাদক অথবা সংযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ তাঁকে জানান ? আসলে এভাবেই তখন ইয়োরোপীয় মডার্নিস্ট লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকেরা চালাতেন মার্কেটিং এর কাজ। সম্পাদকেরা বিজ্ঞাপন হিসেবে একে অপরের প্রকাশিত ও প্রকাশিতব্য কনটেন্ট ছেপেছেন বহু ক্ষেত্রে।
![]() |
| প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত অলংকরণ |
পর্ব ২
শিল্প, চিঠিপত্র ও সমালোচনার কাগজ ' আ রাজাডা' র আত্মপ্রকাশ ১৯১২ সালে। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন পর্তুগীজ মডার্নিজমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি আলফোনসো দুয়ার্তে। পত্রিকার শিল্প নির্দেশক হিসেবে নাম দেখা যায় কোরিয়া ডিয়াসের যিনি পরবর্তীতে পর্তুগাল ছেড়ে চলে যাবেন ব্রাজিল, বিয়ে করবেন ব্রাজিলীয় কবি সেসেলিয়া মেইরেলেসকে। রিভিস্তা ' আ রাজাডা' র অন্যতম বৈশিষ্ট হয়ে উঠেছিল ডিয়াসের অলংকরণ , যে শিল্পের ফর্মকে তিনি সম্বোধন করেছেন ' Solidao ' নামে। এই পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পর্তুগীজ শিল্পের মডার্নিস্ট ঘরানার প্রথম দু' ই শিল্পী আলমাডা নেগ্রেইরোস ও ক্রিস্টিয়ানো ক্রজের আঁকা ছবির প্রিন্ট। কোইমব্রা থেকে প্রকাশিত ' আ রাজাডা ' রাতারাতি হয়ে ওঠে পাঠকপ্রিয় যার অন্যতম কারণ অবশ্যই পত্রিকার দৃষ্টিনান্দনিকতা। তবে এখানে প্রকাশিত ছবি বা অলংকরণগুলি যে আভাঁ গার্দের ভাবনায় উদ্বুদ্ধ ছিল তা নয়। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মিশেল এই আর্ট ফর্মকে করে তোলে অনন্য। এই ঘরানার শিল্পের প্রয়োগ আমরা পরবর্তীতে, অর্থাৎ ১৯২০ তে প্রকাশিত রিভিস্তা ' আ ট্রাডিসাও ' তেও দেখতে পাই। দেখতে পাই সমসাময়িক ' আ বোয়েমিয়া' র ১৯১৪ পরবর্তী কিছু সংখ্যা এবং ১৯১২ এই আত্মপ্রকাশ হওয়া ' আ গালেরা ' তে। তবে ' আ বোয়েমিয়া ' মডার্নিস্ট রিভিস্তা ছিল না। ছিল পর্তুগীজ সাহিত্যের গতানুগতিকতার অনুসারি। তাই এক অর্থে এটিকে আমরা সাহিত্য - সাময়িকীও বলতে পারি।
![]() |
| ' আ রাজাডা ' র আত্মপ্রকাশ সংখ্যার প্রচ্ছদ |
' আ রাজাডা' র মাত্র চারটে সংখ্যাই প্রকাশিত হয়েছে যার বর্ণসংস্থাপন ও ছাপার দায়িত্বে ছিলেন রাজধানী লিসবনের অ্যানুয়ারিও কমার্শিয়াল টাইপোগ্রাফি। কোইমব্রো থেকে লিসবনের দূরত্ব খুব একটা কম নয়। তার পরেও দূরের এই ছাপাখানাকে নির্বাচনের মধ্যে সম্ভবত কাজ করেছে সম্পাদকের প্রোডাকশন কোয়ালিটির প্রতি সতর্কতা।
![]() |
| ' আ রাজাডা ' র আত্মপ্রকাশ সংখ্যার প্রথম পাতা |
![]() |
| ' আ রাজাদা ' র ভেতরের পাতার অলংকরণ |
![]() |
| ' আ রাজাডা' র আত্মপ্রকাশ সংখ্যার শেষ পাতা । ডান দিকে বিজ্ঞাপন |
কোইমব্রো থেকে যখন প্রকাশিত হচ্ছে ' আ রাজাডা ' উত্তর পর্তুগালের ভায়ানা অঞ্চলে আত্মপ্রকাশ করলো ' ও এভ ' নামের এক পত্রিকা যার কিছুটা হলেও পূর্বজ ' আ আগুইয়া ' র থেকে অনুপ্রাণিত। এই সময়ে পর্তুগালে যে সমস্ত মডার্নিস্ট রিভিস্তার জন্ম হচ্ছে তার বেশির ভাগই কোইমব্রো, ভায়ানা অথবা কাস্টেলো অঞ্চলকে কেন্দ্র করে। আমরা দেখেছি ' লিমিয়া' কে কোইমব্রো থেকেই প্রকাশিত হতে। ' ও এভ ' এর ট্যাগলাইন ' Gazeta de Sto. Tirso ' এর অর্থ ' শহরের ইতিহাস বিষয়ক গেজেট, যার থেকে আমাদের বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কোনো কথা নয়, যে এই পত্রিকার মূল বিষয়বস্তু আঞ্চলিক ইতিহাস কেন্দ্রিক। সংখ্যার একটা বিভাগই ছিল ' শহরের ইতিহাস ' নামে যেখানে কোইমব্রোর তিরিশ বছর আগের সচিত্র ইতিহাস প্রকাশ পেতে দেখা যায়। পত্রিকার পাতায় ফুটে ওঠে আঞ্চলিক পাঠকের অংশগ্রহণ। আত্মপ্রকাশ সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে এক দৃষ্টিহীন ব্রেইল শিক্ষকের লেখা কবিতা যিনি তাঁরই মতো দৃষ্টিহীনদের জন্যে সম্পাদকের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন যাতে টাইপোগ্রাফির পাশাপাশি তাঁর লেখা কবিতার ব্রেইল সংস্করণও প্রকাশিত হয়।
![]() |
| আত্মপ্রকাশ সংখ্যার প্রচ্ছদ |
সম্পাদক হোসে কোয়েলহো ডি আন্দ্রাদে সম্পাদিত সাহিত্য বিভাগের দিকে নজর দিলে চোখে পড়বে উত্তর পর্তুগালের দুই গুরুত্বপূর্ণ কবি আফোনসো দুয়ার্তে ( যিনি রিভিস্তা ' আ রাজাডা' র সম্পাদকও বটে) ও কবি জোয়াও ডি লেব্রে এ লিমার কবিতা। এখানে সবচেয়ে নিয়মিত ভাবে লিখতে দেখা যায় আমেরিকো পিরেস ডি লিমাকে যিনি পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন পর্তুগালের অন্যতম খ্যাতনামা মেডিকেল সায়েন্সের অধ্যাপক হিসেবে। ( যখন ' ও এভ ' এর পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর লেখা, তখন তিনি মেডিকেলের ছাত্র) তৃতীয় সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে জুলিও ব্র্যান্ডাও- এর একটি অপ্রকাশিত সনেট ' মোইনহোস ' শিরোনামে। তৃতীয় সংখ্যাতেই প্রকাশিত হতে দেখা যায় বিশিষ্ট চিকিৎসক ও ইতিহাসবিদ জোয়াও ডি মেইরাকে কলম ধরতে পর্তুগীজ সাহিত্যে ফরাসি ও বিদেশি প্রভাব বিষয়ক প্রবন্ধের মাধ্যমে।
![]() |
| ও এভ - এ প্রকাশিত অলংকরণ |
' ও এভ ' এর প্রকাশিত হয়েছিল মোট সাতটি সংখ্যা। এবং শেষের দিকে প্রায় সম্পূর্ণ সংখ্যা ব্যাপী আলোচিত হতো তাঁদের নিজস্ব অঞ্চল কোইমব্রো। সম্পাদক হোসে কোয়েলহো ডি আন্দ্রাদে নিজে পেশায় ছিলেন চিকিৎসক যে কারণে পত্রিকার শেষে তাঁর পেশা সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞাপন সব সময়েই প্রকাশ হতে দেখা গিয়েছে।
![]() |
| একেবারে ওপরে সম্পাদকের পেশা সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন |
' আ রাজাডা ' প্রকাশের ঠিক দু' বছর পর ' শিল্প ও বিজ্ঞানের পাক্ষিক পত্রিকা ' ' আ গালেরা ' র আত্মপ্রকাশ নভেম্বর ১৯১৪ সালে। নভেম্বর ১৯১৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ১৯১৫ - র মধ্যে এই পত্রিকার মোট ছ' টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। তবে মডার্নিজম বা আধুনিকতার প্রয়োগ আমরা খুঁজে পাবো দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে। প্রচ্ছদে ' পাক্ষিক ' লিখে প্রকাশিত হলেও দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ সংখ্যা কিন্তু মাসিক রূপেই প্রকাশিত হয়েছে। ( ২৮ নভেম্বর, ২০ ডিসেম্বর, ৬ জানুয়ারি, ১ ফেব্রুয়ারি ও ২৫ ফেব্রুয়ারি)
![]() |
| আ গালেরা-র আত্মপ্রকাশ সংখ্যার প্রচ্ছদ |
প্রথম পাতাতেই ছাপা হতো লাতিন এপিগ্রাফ " Suave mari magno praeteriti est proceede and futurum " যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় ' অতীতের মিষ্টি সমুদ্র এগিয়ে নিয়ে যায় ভবিষ্যতের দিকে '। পত্রিকার উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের প্রকাশিত কনটেন্টের মধ্যে দিয়ে গড়ে তুলবেন সাহিত্যের অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝে এক সেতু। তাঁরা সফল হয়েছিলেন সেই কাজে। পর্তুগীজ সাহিত্যের অতীতকে ধরতে তাঁরা প্রকাশ করেছেন ব্যক্তি কেন্দ্রিক সংখ্যা। যেমন পত্রিকার শেষ সংখ্যা ( যুগ্ম সংখ্যা) হয়ে উঠেছিল সাহিত্যিক কামিলো ও আন্তোনিও নবরের স্মৃতি সংখ্যা, প্রকাশিত হয় ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৫ তে, রিভিস্তা ' অরফিউ' এর আত্মপ্রকাশের ঠিক এক মাস আগে। ' আ গালেরা ' র শেষ সংখ্যায় সাহিত্যিক পেসোয়া করেছিলেন তাঁর পূর্বজর স্মৃতিচারণ। লিখেছিলেন আন্তোনিওর উদ্দেশে এক গদ্য। এই লেখাটাই বর্তমানে হয়ে দাঁড়িয়েছে দু' ই ভিন্ন ঘরানার সাহিত্যিকের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের দলিল। কবি মারিও ডি সা কারনেইরো দিয়েছিলেন আন্তোনিওকে উৎসর্গীত এক কবিতা, নাম ' আন্তো '।
![]() |
| প্রথম পাতায় লাতিন এপিগ্রাফ |
![]() |
| আ গালেরা-র প্রথম পাতা (বাঁদিকে সূচি ) |
আত্মপ্রকাশ সংখ্যার নির্দেশকমণ্ডলীতে নাম দেখা যাচ্ছে আলভেস মার্টিনস, কাস্তো কাবরাল, ফেরেইরা মন্তেইরো, গার্সিয়া পুলিদো, নিকোলাও সবরিনহো, অস্কার সোয়ারেজ ও টিটো বেটেনকোর্টের। টিটোর ভাই তারকুইনিও বেটেনকোর্ট ছিলেন ' আ গালেরা ' র শিল্প নির্দেশক। ( এখানে ' সম্পাদকমণ্ডলীর বদলে ' নির্দেশকমণ্ডলী ' লেখবার কারণ পর্তুগীজ ও স্প্যানিশ রিভিস্তা এবং ফরাসি পোতি হ্রভু- র ক্ষেত্রে ' সম্পাদক / এডিটর ' শব্দটি ব্যবহার হয় না। লেখা হয় 'ডিরেক্টর /নির্দেশক'।)
![]() |
| আত্মপ্রকাশ সংখ্যা বাদে বাদ বাকি প্রতিটি সংখ্যাতেই এই ছবিটি ব্যবহৃত হয়েছে প্রচ্ছদে । |
১৯১৪ তে রাজধানী লিসবন থেকে আত্মপ্রকাশিত ' সমালোচনা, সাহিত্য ও শিল্পের পত্রিকা ' ' আ রেনাসেনসা ' ( রেনেসাঁস) ছিল মাত্র এক ফর্মার। ছাপা হতো লিসবনের অ্যানুয়ারিও কমার্শিয়াল টাইপোগ্রাফি প্রেস থেকে। এই একই প্রেস থেকে দু' বছর আগে ছাপা হয়েছে ' আ রাজাডা ' এবং দু' বছর পরে প্রকাশ পাবে ' আ সেনটাউরো ' ও ' টেরা নোসা ' নামক দুই রিভিস্তা যাদের সম্পর্কে আমরা একটু বাদেই জানতে পারবো। অভূতপূর্ব নন্দনতাত্ত্বিক পরিচর্যায় প্রকাশিত হলেও সংখ্যার দাম হতো মাত্র পাঁচ সেন্ট যা তখনকার পর্তুগীজ অর্থনীতির নিরিখে বিচার করলে খুবই কম, বিশেষত যদি ১৯১৭ তে আত্মপ্রকাশ করা হৃষ্টপুষ্ট, শিল্পগুণ সম্পন্য ' পর্তুগাল ফিউচারিস্তা ' র চল্লিশ সেন্ট দামের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
![]() |
| আত্মপ্রকাশ / একমাত্র সংখ্যার প্রচ্ছদ |
নির্দেশকমণ্ডলীর রাজনৈতিক বা নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ যাই হয়ে থাকুক না কেন, ' আ রেনাসেনসা ' র উদ্দেশ্য ছিল গণতান্ত্রিক পরিবেশে পর্তুগীজ সংস্কৃতিতে নিয়ে আসা আধুনিকতা। তাঁদের উদ্দেশ্যের সঙ্গে পত্রিকার নামটি ছিল সাযুজ্যপূর্ণ --- ' রেনেসাঁস ' শব্দের অর্থ তো তাই ? তাঁরা ঠিক কী করতে চেয়েছিলেন সেটা বুঝতে গেলে দেখতে হবে কনটেন্ট। প্রথমেই আসা যাক সম্পাদক কোয়েলহো পাচেকো সম্পর্কে যিনি তাঁর নিজের নামে মাত্র একটি কবিতাই ছাপতে দিয়েছিলেন কোনো পত্রিকাকে। ছাপা হয়েছিল রিভিস্তা ' অরফিউ ' এর তৃতীয় সংখ্যায়। 'অরফিউ' সম্পাদক পেসোয়ার মৃত্যুর পর এই একটি কবিতাই কোহেলহোকে এনে দেয় পর্তুগীজ সাহিত্যে পরিচিতি। ' আ রেনাসেনসা ' তে অবশ্য একটি গদ্য তিনি লিখেছেন, ' লাইন ' ছদ্মনামে ' zini ' শীর্ষক। প্রকাশিত হয়েছে আলফ্রেদো গুইসাদোর কবিতা যিনি তাঁর সমসাময়িক কবিদের তুলনায় আলোচিত হয়েছেন অপেক্ষাকৃত কম, যোগ দিয়েছিলেন রিভিস্তা ' অরফিউ ' গোষ্ঠীতে। আলফ্রেদো কবিতা লিখেছেন ছদ্মনাম পেদ্রো মেনেজেস ব্যবহার করে যার ধরন ছিল পর্তুগীজ কাব্যের গতানুগতিকতা থেকে ভিন্ন। প্রকাশিত হয়েছে কবি মারিও দি সা কারনেইরোর কবিতা যিনি লিখেছিলেন রাশিয়ান ছদ্মনামে। কবিতাটি ছিল ' আলেম '। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি অবশ্যই ফারনান্দো পেসোয়ার ' Impressoes do Crepusculo ' যার ইংরেজি তর্জমা করলে দাঁড়ায় ' Impression of the Twilight '. এই কবিতাটিকে বলা হয় ' pamphlet poem ' যা তাঁর ব্যক্তিগত দর্শন পলিজম কেন্দ্রিক। ' আ রেনাসেনসা ' র আত্মপ্রকাশ সংখ্যার শুরুর দিকেই পাওয়া যাবে জুলিও দান্তার লেখা একটি সনেট যিনি ইতিমধ্যেই ছিলেন পর্তুগালের বাণিজ্যিক সাহিত্য মহলের সুপরিচিত নাম, যাঁকে আমরা পরবর্তীতে দেখবো ' অরফিউ' গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত হতে।
![]() |
| সংখ্যার প্রথম পাতা |
' বন্ধুসম পাঠকের ' উদ্দেশে পত্রিকার আত্মপ্রকাশ বা একমাত্র সংখ্যার সম্পাদকীয়তে, সম্পাদক পেচেকো লিখেছেন, " If my chords don' t delight you, I'll suffer alone, disillusioned, unhappy...If however you feel all my dream I will try to fly,fly venturing into the confused and indecisive ether where so many limits are sought and are not reached, and if in my vague,idealistic path I find my new divine,subtle, vaporous glow that you can feel as good as I do,I will bring you inside my soul,so that I can dazzle you with the light, passionate enchantment of your word,which will give us so much life, because it feels both of them! "
এই সম্পাদকীয়র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলো বোধ হয় ' vague ', ' dream ' ও ' idealistic ' যা সাহিত্য তত্ত্বের symbolism এর দিকেই নির্দেশ করে ? সংক্ষেপে বললে, ' আ রেনাসেনসা ' ছিল পলিজিমের প্রচারক যদিও একবারের জন্যেও তাঁদের তত্ত্বের নামটিকে তাঁরা লিখিত আকারে প্রকাশ করেননি।
পত্রিকার প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন মার্টিনো গোমেজ ডা ফনসেকো যাঁকে আমরা ১৯১৬ তে রিভিস্তা ' টেরা নোসা' র প্রচ্ছদ করতেও দেখবো।
![]() |
| আ রেনাসানসে-র ব্যাক কভার |
রিভিস্তা ' আ লাবারেদা ' নিজেদেরকে ' সাহিত্য ও শিল্পের মাসিক ' রূপে বর্ণনা করেছে, যার আত্মপ্রকাশ উত্তর পর্তুগালের পোর্তো অঞ্চলে। এই পত্রিকা ছিল saudism এর প্রচারক। ( saudism এর ইংরেজি তর্জমা করলে দাঁড়ায় নস্টালজিয়া) অর্থাৎ পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার বিষয় হবে অতীতচারণা আর ফর্মটিকে হতে হবে আধুনিক। ১৯১৪ থেকে ১৯২৬ এর মধ্যে ' আ লাবারেদা' র প্রকাশিত হয়েছিল মোট বাইশটি সংখ্যা। প্রথম অধ্যায়ে বারোটি যার পর সাময়িক বিরতি নিয়ে আরও দশটি। আত্মপ্রকাশ সংখ্যার যে প্রচ্ছদটি সোয়ারেজ লোপেজ করেছিলেন, সেটাকে মডার্নিস্ট লিটল ম্যাগাজিন প্রচ্ছদের মধ্যে অন্যতম সেরা প্রচ্ছদ বলে ধরা হয়ে থাকে, অন্ততপক্ষে শিল্প সমালোচকেরা তাই মনে করেন। প্রচ্ছদে দেখা যাচ্ছে, পেছন ফিরে বসে এক মানুষ, যে ভাবনা সমালোচকেরা সংখ্যায় প্রকাশিত আভাঁ গার্দে উদ্বুদ্ধ লেখার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ বলে মনে করেছেন।
![]() |
| ' আ লাবারেদা '-র আত্মপ্রকাশ সংখ্যার প্রচ্ছদ |
চপোর্তো অঞ্চলের কাস্টা কারেগাল প্রেস, যাঁরা ইতিমধ্যে রিভিস্তা ' আ আগুইয়া ' ও ' আ পর্তুগুয়েসা ' ছাপিয়ে ' লিটল ' মহলে হয়ে উঠেছিলেন সুপরিচিত, বরাত পান ' আ লাবারেদা ' ছাপানোর। নারসেসো ডি আজেভেদো ছিলেন সম্পাদক ও শিল্পী জোয়াকিম লোপেজকে দেখা যায় শিল্প নির্দেশকের পদে। সেই জোয়াকিম, যিনি পরবর্তীতে পোর্তোর ফ্যাকালটি অফ ফাইন আর্টস এ যুক্ত হবেন শিক্ষকতায়, যার আভাস শিল্প কলার ছাত্র হিসেবে ' আ লাবারেদা ' র প্রচ্ছদ ও অলংকরণেই তিনি দিয়েছেন। লোপেজ ছিলেন impressionist ঘরানার শিল্পী। যিনি ১৯২০ তে চলে যান ফ্রান্স, শিল্পের খুঁটিনাটি শিখে আসতে। তাঁর তত্ত্বাবধানেই ' আ লাবারেদা ' তে প্রকাশিত হয়েছে পোর্তো অঞ্চলের দুই শিল্পী আন্তোনিও কারনেইরো ও ভিয়েইরা পর্তুয়েন্সের করা দুটি ন্যুড স্কেচ। প্রকাশিত হয়েছে তরুণ শিল্পী আদ্রিয়ানো সৌসা লোপেজ এর আঁকার প্রিন্ট।
![]() |
| বাঁদিকের ছবিটি প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত ও ডান দিকেরটি দ্বিতীয় সংখ্যায় |
পত্রিকার সাহিত্য বিভাগে ছিল প্রবীন ও নবীনের যুগলবন্দী। আত্মপ্রকাশ সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে পর্তুগীজ সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত লেখক এসা ডি কুইরোজ ও কামেলা কাস্তেলো ব্রাঙ্কোর কিছু অপ্রকাশিত চিঠি ছাপা হতে। একই ধারা অব্যাহত রেখে দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে ম্যানুয়েল লারনজেইরার অপ্রকাশিত চিঠি। অপর দিকে কবিতা বিভাগ দখল করেছে নবীন ও তরুণেরা। কবিতা লিখছেন আফোনসো দুয়ার্তে, মারিও বেইরাও কিংবা তেইক্সেইরা ডি পাস্কোয়েস। আত্মপ্রকাশ সংখ্যার প্রথম লেখাটাই ছিল symbolist কবি ইউজেনিও ডি কাস্ত্রোর একটি প্রেমের সনেট। এই সংখ্যায় প্রকাশিত সবচেয়ে চমকপ্রদ লেখাটি বোধ হয় আন্তোনিও প্যাট্রিসিওর ' Dialogo na Alambra '. এটি ছিল এক নাট্যাংশ যেখানে উঠে আসছে পর্তুগালের আন্দালুসিয়ান মনুমেন্টের নিচে দাঁড়িয়ে দুই বন্ধুর শিল্প ও নন্দনতত্ত্ব বিষয়ক বিতর্ক। তবে সম্পাদক নারসিসো তাঁর পত্রিকায় যে সমস্ত সনেট প্রকাশ করেছেন তা সবই পত্রিকার মতাদর্শ saudism বা নস্টালজিয়া কেন্দ্রিক।
![]() |
| আত্মপ্রকাশ সংখ্যার টাইটেল পেজ |
পোর্তোর বেশির ভাগ কাগজই যখন গতানুগতিকতার অনুসারি তখন ' আ লাবারেদা' র প্রকাশ অঞ্চলের সাহিত্যে এনেছিল আধুনিকতার ছাপ। তাঁরা তাঁদের পূর্বজ ও সমসাময়িক পত্রিকাকে দেখাতে চেয়েছেন আভাঁ গার্দের রূপ।
রিভিস্তা ' কনটেম্পোরানিয়া ' র নাম থেকেই বোঝা যায় তাঁরা হতে চেয়েছেন সমসাময়িক সাহিত্যের প্রচারক। এটি এমন এক পত্রিকা যার শুরু খুব একটা ভালো না হলেও কনটেন্টের অপরিহার্যতায় হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯১৫ তে আত্মপ্রকাশিত প্রথম সংখ্যার নাম দেওয়া হয়েছে ' স্পেসিমেন '। প্রথম লেখাটাই হলো এক নন্দনতাত্ত্বিকের প্রতি খোলা চিঠি। পত্রিকার গতিপ্রকৃতি কী হতে চলেছে তা এই লেখাটির থেকেই কিছুটা ধারনা করা যাবে। লেখা হয়েছে, " This is a magazine, not by futurists, a negetive epithet, especially for the generation that this ' esthete ' represents, but from ' contemporaries ',young people of his time who want to promote Portugal. " স্পেসিমেন সংখ্যাটি ছিল তিন ভাগে বিভক্ত। তিনটে আলাদা প্রচ্ছদ সহযোগে। ( প্রথম প্রচ্ছদ করেছিলেন আলমাডা আর বাকি দুটো জর্জ বারাডাস।) প্রচ্ছদের বিষয় ছিল যুদ্ধ কেন্দ্রিক যা প্রকাশের এক বছরের মাথায় পর্তুগাল এগিয়েছে যুদ্ধের পথে। প্রকাশিত লেখাও বিষয়ের ব্যতিক্রম নয়। অবশ্য এই সময়ে প্রায় সমস্ত লিটল ম্যাগাজিন ও সাময়িক পত্র ছিল যুদ্ধ নিয়ে চিন্তিত যার ব্যতিক্রম রিভিস্তা ' অরফিউ 'ও ছিল না। স্পেসিমেন সংখ্যার লেখাগুলোকে বুঝতে গেলে আমাদের বুঝতে হবে সমসাময়িক রিভিস্তার গতিপ্রকৃতি। এই একই সময়ে প্রকাশিত হচ্ছে রিভিস্তা ' ইহ্ রিয়াল!' যার মধ্যে শিল্প সাহিত্যের তুলনায় রাজনৈতিক লেখাপত্রের মাত্রাই ছিল বেশি। ' ইহ্ রিয়াল!' এ তখন প্রকাশিত হয়েছে ফারনান্দো পেসোয়ার ' O Preconceito da Ordem ' যার বিষয়বস্তু পাচেকো সম্পাদিত ' আ রেনাসেনসা ' য় প্রকাশিত লেখায় সরকারি সেক্যুলারাইজেশন। অথচ রিভিস্তা ' কনটেম্পোরানিয়া ' নিয়েছিল বাদ বাকি সমস্ত রিভিস্তার বিপরীত অবস্থান। তাঁরা প্রকাশ করলেন ডিক্টেটর পিমেন্তা ডি কাস্ত্রোর সপক্ষে কিছু লেখা। ( সম্ভবত এটাই ছিল এই পত্রিকার প্রথম অধ্যায়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।) একই সঙ্গে স্পেসিমেন সংখ্যায় ছাপলেন নারী বিষয়ক কিছু লেখা কিন্তু অদ্ভূত ভাবে সেগুলো ছিল মিসোজিনিস্ট যা নারীকে ক্রমাগত ঘরে বন্দি রাখবার কথাই বলে গিয়েছে।
![]() |
| বাঁদিকে স্পেসিমেন সংখ্যার প্রথম প্রচ্ছদ ও ডান দিকে দ্বিতীয় ভাগের প্রচ্ছদ |
' কনটেম্পোরানিয়া ' র সম্পাদক হোসে পেচাকো ও শিল্প নির্দেশক আলমাডা। পত্রিকার পাতায় কসমোপলিটান কালচার বিষয়ে বিভিন্ন ভাষার লেখা তাঁরা প্রকাশ করেছেন। মাসিক পত্রিকা রূপে আত্মপ্রকাশিত ' কনটেম্পোরানিয়া ' র মে, ১৯২২ থেকে মার্চ, ১৯২৩ অন্তরবর্তী সময়ে প্রকাশিত প্রথম ন' টি সংখ্যা নিয়মিত ভাবেই প্রকাশিত হয়। এর পর ১৯২৪ এ একটি, ১৯২৫ এ একটি ক্রোড়পত্র ও ১৯২৬ এ মোট তিনটি সংখ্যা প্রকাশের মধ্যে দিয়ে বন্ধ হয় পত্রিকার প্রকাশ। ( ১৯১৬ থেকে ১৯২১, কেন কোনো সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি তার সম্ভব্য কারণ আমরা আগেই আলোচনা করেছি।)
![]() |
| স্পেসিমেন সংখ্যায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপন |
' কনটেম্পোরানিয়া ' র পাতায় তৈরি হয়েছে নবীন বনাম প্রবীনের দ্বন্দ্ব। দেখা গিয়েছে গতানুগতিকতা বনাম আধুনিক সাহিত্যের বিতর্ক। যে বিতর্কের অন্যতম প্রেক্ষাপট হয়ে ওঠে পর্তুগালের ফাইন আর্টস আকাদেমির গভার্নিং বডির নির্বাচন। ' কনটেম্পোরানিয়া ' গোষ্ঠির বক্তব্য, নির্বাচিত সদস্যেরা প্রত্যেকেই প্রাচীনপন্থী। তাঁরা মডার্ন আর্ট সম্পর্কে কতটাই বা বোঝেন! ১৯২৫ এর ক্রোড়পত্রে বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে এই বিতর্ককে কেন্দ্র করে। এই পত্রিকায় ' নারী ' হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। অলংকরণে যেমন স্থান পেয়েছে নারীর অবয়ব, লেখক তালিকাতেও তাঁরা হয়ে উঠেছেন গুরুত্বপূর্ণ। যেমন সপ্তম সংখ্যায় এমা ডা কামারা রেইস, ভেরা গার্ব ছদ্মনামে লিখেছেন পর্তুগালের সাত জন নবীন সংগীত পরিচালককে নিয়ে প্রবন্ধ। সেই সময়ের ইয়োরোপীয় মডার্নিস্ট লিটল ম্যাগাজিনে সংগীত নিয়ে খুব একটা চর্চা দেখা যায় না। তাই এই প্রবন্ধ নিঃসন্দেহে পত্রিকাকে করে তোলে ব্যতিক্রমী। ঘটনা হলো, ' কনটেম্পোরানিয়া ' সংগীতকে দিয়েছিল গুরুত্ব। যে কারণে লুইস মোইতা বা ম্যানুয়েল রামোস সুযোগ পেয়েছেন মারিও আন্তোনিয়েতা লিমা ক্রুজের মতো সংগীত পরিচালককে নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে। তাঁরা যে স্প্যানিশ ভাষা ও সাহিত্যকে ভালোবাসেন, স্প্যানিশের প্রতি পোষণ করেন এক অনুকম্পায়ী দৃষ্টিভঙ্গি তা তাঁদের দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রকাশিত প্রথম সংখ্যার সূচি পরবর্তী পাতায় উল্লেখ থেকেই বোঝা যাবে।
![]() |
| ' কনটেম্পোরানিয়া '-তে প্রকাশিত অলংকরণ ও ছবির প্রিন্টের নমুনা |
![]() |
| ১৯২৫ এ প্রকাশিত ক্রোড়পত্রের প্রথম পাতা |
যদি জানতে হয় বিশের দশকে পর্তুগালের শিল্প- সাহিত্য আঙিনায় কী ঘটেছে, তাহলে পড়তে হবে ' কনটেম্পোরানিয়া ' র ১৯২৫ এ প্রকাশিত ক্রোড়পত্র। ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত দুটো লেখা পর্তুগীজ মডার্নিজমের গবেষণায় এই দশকের প্রতিনিধি স্থানীয় হয়ে উঠেছে। একটি লেখা অবশ্যই ব্রাজিলের নতুন প্রজন্মকে নিয়ে যাঁরা ঝুঁকছেন Jazz সংগীতের দিকে আর দ্বিতীয়টি আতলান্তিক মহাসাগরের এপারেই পর্তুগালে Jazz এর গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কিত। ১৯২৪ এ প্রকাশ পায় একটি মাত্র সংখ্যা আর '২৫ এ একটি ক্রোড়পত্র, যার কারণ অবশ্যই সম্পাদক হোসে পাচেকোর অসুস্থতা। মজার বিষয়, এই ক্রোড়পত্রে সমসাময়িক প্রায় প্রত্যেক সাহিত্যিকের চর্চার কথা উল্লেখ করা হলেও বাদ পড়েছেন ফারনান্দো পেসোয়া যিনি কোনো ভাবেই পত্রিকা গোষ্ঠী অথবা সেই প্রজন্মের কাছে অপরিচিত নন। পাচেকোর অসুস্থতার অর্থ তাঁর পক্ষে আর সম্পাদনা সম্ভব নয়, যা প্রকারান্তরে ' কনটেম্পোরানিয়া ' বন্ধের পূর্বাভাস। তবে তিনি তাঁর সম্পাদিত রিভিস্তার মাধ্যমেই থেকে গিয়েছেন পর্তুগীজ সাহিত্যে চিরস্মরণীয়।
![]() |
| ১৯২৬ এ প্রকাশিত শেষ সংখ্যার প্রচ্ছদ |
![]() |
| ' কনটেম্পোরানিয়া ' র শেষ সংখ্যায় প্রকাশিত রবীন্দ্র দর্শন বিষয়ক একটি লেখা । |
রিভিস্তা ' ইহ্ রিয়াল! ' এর ট্যাগলাইন ' সমালোচনা ও রাজনৈতিক মতবাদের সাপ্তাহিক ট্যাবলয়েড '। সম্পাদক জোয়াও কামোসাসের সম্পাদনায় যার একটি মাত্র সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৩ মে,১৯১৫ তে।
![]() |
| ' ইহ্ রিয়াল! ' এর আত্মপ্রকাশ সংখ্যা |
পত্রিকা গোষ্ঠী পত্রিকার পাতায় নিজেদের সম্বোধন করেন ' এক ডজন বিশুদ্ধ পর্তুগীজ ' বলে, যাঁদের কাজ ছিল উন্নততর পর্তুগালের স্বপ্ন দেখা, রক্ষা করা দেশের গণতন্ত্র। এই পত্রিকার আত্মপ্রকাশ এমন এক সময়ে যখন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গণতন্ত্র ভুলে চাইছেন পর্তুগাল ফিরে যাক মোনার্কিয়াল সিস্টেম অফ গভার্নেন্সে। বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী সম্পাদক যিনি ১৯২৩ ও ১৯২৫ এ হবেন পর্তুগালের শিক্ষামন্ত্রী তাঁর পত্রিকা ' ইহ্ রিয়াল! ' এর মাধ্যমে করেছেন ডিক্টেটর পিমেন্তা ডি কাস্ত্রোর বিরোধিতা। অবশ্য পরবর্তীতে আমরা দেখবো কামোসাসকে নিজের দেশ থেকেই বিতাড়িত হয়ে আমেরিকা যেতে, যেখানে তিনি মারা যান ১৯৫১ তে।
পত্রিকার একমাত্র সংখ্যায় কামোসাস চিহ্নিত করলেন তাঁদের প্রধান শত্রু ডিক্টেটর পিমেন্তা ও তাঁর সেনা প্রধান পাইভা কসেইরোকে। এই পাইভাকে নিয়ে কামোসাস লিখেছেন ' Nun Alvares ' শীর্ষক গদ্য। এঁকে নিয়ে সার্ভিও সিলভোর আরও একটি লেখা প্রকাশিত হতে দেখা যায়, যেখানে তিনি লেখেন, " The spectacular arrogance of Paiva Cauceiro defines well the miserable treachery of the Government." এই লেখাটিতে লেখক দেশের সেনা প্রধানকে রীতিমতো 'ক্রিমিনাল'শব্দের মাধ্যমে অভিহিত করেছেন। লেখক এ বুস্ত্রভ লিখেছেন ' Ironic Letters ' সেনার প্রধানের প্রতি তাঁর যাবতীয় ক্ষোভ উগরে দিয়ে।
পিমেন্তা ডি কাস্ত্রা পর্তুগালে যে খুব বেশি দিন শাসন করেছিলেন তা নয়। মাত্র চার মাস, জানুয়ারি থেকে মে, ১৯১৫। আর এই চার মাসেই খুব স্বাভাবিক ভাবে হয়ে উঠেছিলেন সমস্ত রাজনৈতিক দলের চক্ষুশূল। তাঁর একনায়কতন্ত্রী শাসনকালে প্রথম বারের জন্যে দেখা গিয়েছিল পর্তুগালের সমস্ত রাজনৈতিক দলকে সংঘবদ্ধ হতে। ' ইহ্ রিয়াল! ' প্রকাশের ঠিক এক দিন বাদে, ১৪ মে ডিক্টেটরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে নৌসেনা। নৌসেনা প্রধান লিয়টি ডো রিগোর নেতৃত্বেই অবশেষে ক্ষমতাচ্যূত হন পিমেন্তা।
পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল পর্তুগীজ মডার্নিজমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখক ফারনান্দো পেসোয়ার একটি আর্টিকেল, ' The Prejudice of the Order ' শিরোনামে যেখানে তিনি পিমেন্তার বিরুদ্ধাচারণই করেন। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় পেসোয়া ১৪ মে, ১৯১৫ - র গণঅভ্যুত্থানকে ' stomach revolution ' বলে কটাক্ষ করছেন পরক্ষে সমর্থন করছেন পিমেন্তাকেই। লিখছেন, " Pimenta was the purest representative of the middle classes who came to power in Portugal. " এর থেকে যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে তা হলো পেসোয়া তাঁর সাহিত্যের মাধ্যমে সর্বজন গ্রাহ্য হলেও, রাজনৈতিক মতাদর্শের দৃঢ়তা তাঁর একেবারেই ছিল না। তাঁর পরিবর্তিত মতের সপক্ষে, ধংসাত্মক আন্দোলনের যে তিনি বিরোধি তা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতিকদের যা দল বদলের হিড়িক তাতে রাজনীতিতে মতাদর্শ বলে আদৌ কিছু আছে কিনা, তা বর্তমান প্রজন্মের কাছে ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে পর্তুগাল রাজনীতির প্রেক্ষাপটে পেসোয়ার মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব কিংবা আত্মবিরোধিতা এই মূহুর্তে খুবই সাধারণ ঠেকতে পারে মানুষের কাছে।
' ইহ্ রিয়াল! ' এর ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৮৩ তে এবং এখনো বাজারে সংখ্যাটি উপলব্ধ।
এই একই বছর প্রকাশিত হচ্ছে ফারনান্দো পেসোয়া সম্পাদিত রিভিস্তা ' অরফিউ ' যেটিকে পর্তুগালের মডার্নিস্ট লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। পত্রিকা সম্পর্কে জানবার আগে ব্যক্তি পেসোয়া সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক।
![]() |
| ফারনান্দো আন্তোনিও নোগুয়েইরো পেসোয়া |
সাহিত্যিক, সাহিত্য সমালোচক, অনুবাদক, প্রকাশক ও দার্শনিক ফারনান্দো আন্তোনিও নোগুয়েইরো পেসোয়ার জন্ম ১৮৮৮ সালে। তিনি যে শুধু নিজের নামেই সাহিত্যকৃতির সাক্ষর বহন করেছেন তা নয়। লিখেছেন ৭৫ টি ছদ্মনামে, ফরাসি, স্প্যানিশ, পর্তুগীজ ও ইংরেজিতে ছিলেন সমান পারদর্শী। ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার শিক্ষা গ্রহণ করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান শহরে, যেখানে কেটেছে তাঁর স্কুল জীবন। কারণ পেসোয়ার বাবার মৃত্যুর ঠিক দু' বছরের মাথায় তাঁর মা বিয়ে করেন দক্ষিণ আফ্রিকায় নিযুক্ত এক পর্তুগীজ রাষ্ট্রদূতকে। ইংরেজি ও ফরাসি শিক্ষা যে পরবর্তীতে তাঁর লেখক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল তা তিনি স্বীকার করেছেন লিখিত আকারেই। অনুবাদক হিসেবে পেসোয়ার ছিল নিজস্ব পদ্ধতি। তাঁর মতে, " A poem is an intellectualised impression,an idea made emotion, communicated by others by means of a rhythm.This rhythm is double in one like the concave and convex aspects of the same arc : it is made up of a verbal or musical rhythm and of a visual or image rhythm which occurs inwardly with it.The translation of a poem should therefore confirm absolutely to the idea or emotion which constitutes the poem, to the verbal rhythm to which that idea or emotion is expressed ; it should conform relatively to the inner or visual rhythm keeping to the images themselves when it can but keeping always to the type of image. It was on this criterion that I based mu translations into Portuguese of Poe' s ' Annabel Lee ' and ' Ulalume ' which I translated not because of their great intrinsic worth, but because they were a standing challenge to translators."
পেসোয়াকে জ্যোতিষ শাস্ত্রের প্রতিও আকর্ষিত হতে দেখা যায়। তিনি সারা বিশ্বের, (খাতায় কলমে) বহু বিখ্যাত মানুষের ভাগ্য গণনা করেছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু নাম উইলিয়াম শেক্সপিয়র, লর্ড বায়রন, অস্কার ওয়াইল্ড, বেনিতো মুসোলিনি, সালাজার প্রমুখ।
এ হেন বৈচিত্রপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী পেসোয়া যখন পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের চিয়াদো অঞ্চলে অবস্থিত কফি শপ ' আ ব্রাসিলেইরা ' তে বসে আড্ডা জমাবেন ' অরফিউ ' গোষ্ঠীকে নিয়ে, তা যে হয়ে উঠবে আলোচনার বিষয় সে আর আশ্চর্য কী!
![]() |
| লিসবনে অবস্থিত কফি শপ ' আ ব্রাসিলেইরা ' |
![]() |
| ' আ ব্রাসিলেইরা' র সামনে নির্মিত পেসোয়ার মূর্তি |
রিভিস্তা ' অরফিউ' এর আত্মপ্রকাশ মার্চ ২৪, ১৯১৫ তে। যার পরবর্তী ও শেষ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় জুনের ২৮ তারিখ। প্রাথমিক ভাবে ত্রৈমাসিক আকারে প্রকাশের ইচ্ছে থাকলেও মাত্র দুটি সংখ্যাতেই পেসোয়াকে থেমে যেতে হয়েছিল তাঁর অর্থনৈতিক অসংগতির কারণেই। বাস্তবে ' অরফিউ ' গোষ্ঠীর লেখক ও শিল্পীরা কেউ পর্তুগীজ সাহিত্য মহলের পরিচিত মুখ না হলেও পত্রিকা প্রকাশের সাথে সাথে লিসবনে দেখা দেয় আলোড়ন। মাত্র দু'টি সংখ্যার মাধ্যমে ' অরফিউ ' এতটাই আলোড়িত করেছিল, যে পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হওয়ার পরেও সমসাময়িক পত্র- পত্রিকায় চলেছে তাঁদেরকে নিয়ে আলোচনা। আলোড়নের কারণ, ' অরফিউ ' এনেছিল পর্তুগীজ সাহিত্যের ফর্মে নতুনত্ব। ২৪ মার্চ যেখানে পত্রিকার আত্মপ্রকাশ হচ্ছে , সেখানে মাত্র তিন দিনের মাথায় স্প্যানিশ পত্রিকা ' ও মুনডো ' তে প্রকাশিত হচ্ছে প্রতিক্রিয়া। তাঁরা লিখছেন, অরফিউ হলো, " a sort of summary of the various modern currents in our literature...various collaboration of the most characteristic figures among the new ones." আধুনিকতা ও নতুনত্বের ওপর যে জোর ' অরফিউ ' দিয়েছিল তা প্রকারান্তরে পত্রিকাটিকে করে তুলেছে আভাঁ গার্দের অনুসারী। ১৯৯৪ তে প্রকাশিত ' অরফিউ ' এর ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণের সম্পাদক ফারনান্দো কাবরাল মার্টিনস, ভূমিকাতে লিখেছেন, " Orpheu is a synecdoche of modernism, a magazine - sign of the moment,whose name starts to identify a generation and a poetics." ' অরফিউ ' যদি একাধারে লিসবনের সাহিত্যে এনে থাকে আধুনিকতার প্রভাব তবে আন্তর্জাতিকতায় হয়ে ওঠে ইয়োরোপীয় মডার্নিস্ট লিটল ম্যাগাজিনের প্রথম সারির পত্রিকা। আত্মপ্রকাশ ১৯১৫ তে হলেও পত্রিকার সলতে পাকানোর পর্বটি শুরু হয় ১৯১২-১৩ সালে যখন গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত সদস্য ফারনান্দো পেসোয়া, মারিও ডি সা কারনেইরো, আলফ্রেদো পেদ্রো গুইসাদো, আরমান্দো কোর্তেজ রডরিগেজ ও আলমাডা নেগ্রেইরোস এক সঙ্গে মিলিত হন লিসবনের ' আ ব্রাসিলেইরা ' কফি শপে।
![]() |
| 'অরফিউ ' এর আত্মপ্রকাশ সংখ্যার টাইটেল পেজ |
পত্রিকার প্রচ্ছদে শিল্পের যে ফর্ম ব্যবহৃত হয়েছে সেটিকে কি ট্রান্সলান্টিক বললে ভুল হবে? কারণ শিল্প বিভাগে নিযুক্ত তিন শিল্পী সা কারনেইরো, সান্টা রিটা পিন্টর ও হোসে পাচেকো বেশ কিছুকাল ফ্রান্সে থেকে শিখেছিলেন ফরাসি শিল্পকলা। যে কারণে অপর শিল্পী আলমাডা নেগ্রেইরোসকে লিখতে দেখা যায়, " It happened here (...)the same thing that erupted a little earlier in Paris : meeting of letters and paintings." ' অরফিউ ' গোষ্ঠীরই অন্তর্ভুক্ত দুই ব্রাজিলীয় সদস্য রোনাল্ড ডি কারভালহো ও লুইস ডি মোনতালভর পত্রিকার আদর্শের সঙ্গে এতটাই ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িয়ে গিয়ে ছিলেন যে তাঁরা ' অরফিউ' এর দপ্তর হিসেবে আত্মপ্রকাশ সংখ্যায় পর্তুগাল ও ব্রাজিল, দুই দেশের নাম উল্লেখ করেন যেখানে ব্রাজিলীয় সংস্করণ - এর সম্পাদক হিসেবে ছাপা হতে শুরু করে রোনাল্ড ও লুইসের নাম।
![]() |
| অরফিউ-এর আত্মপ্রকাশ সংখ্যার প্রচ্ছদ |
'অরফিউ'তে প্রকাশিত লেখায় পেসোয়া নিয়ে এসেছিলেন sensationalism, paulism ও intersectionism নামক তিন তত্ত্ব যা তাঁদের সমসাময়িক বাকি রিভিস্তাগুলি থেকে করে তোলে স্বতন্ত্র। রেঁনেসাস নামক নস্টালজিক জাতীয়তাবাদ ও গতানুগতিক লোক দেখানো দেশপ্রেম থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে পেসোয়া নিয়েছিলেন লিবারেল সাহিত্যের পথ। যে কারণে পত্রিকা প্রকাশের বহু আগে পেসোয়া ও কারনেইরোর মধ্যে হওয়া এক বৈঠকে তাঁরা ঠিক করেন, পত্রিকার নাম হবে ' ইউরোপা '। তবে কেন নামটি বদলে গ্রীক মাইথোলজির চরিত্র অরফিয়াস অনুসারে ' অরফিউ ' রাখা হয়, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। যদিও ' অরফিউ ' প্রকাশের পর এই গোষ্ঠী নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন, ' Portuguese who write for Europe ' আর ঠিক এভাবেই তাঁরা সমগ্র ইয়োরোপে ছড়াতে চেয়েছিলেন তাঁদের বার্তা।




































Comments
Post a Comment