|| ব্ল্যাক অরফিয়াস : আ জার্নাল অফ আফ্রিকান অ্যান্ড অ্যাফ্রো- আমেরিকান লিটারেচার ||

সুশোভন রায়চৌধুরী




আফ্রিকা বললেই আমাদের বাঙালির যেন প্রথমেই মাথায় আসে জঙ্গল, আফ্রিকান সাফারি, মিশরের পিরামিড কিংবা ফারাওদের কথা। আফ্রিকা যেন এখনো সেই ছোটোবেলার নীল নদ, নেলসন ম্যান্ডেলা ও নিপিড়ীত, শোষিত কিছু কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের দেশ। ঔপনিবেশিক আধিপত্যে জর্জরিত একটা মহাদেশের উন্নতি কি একেবারেই হয়নি? হয়তো হয়েছে কিন্তু কতজনই বা দেখেছেন উপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষে যেতে আফ্রিকান লোকাচার ও লোক- ঐতিহ্যকে? কতজনই বা উপলব্ধি করেছেন মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম সভ্যতা কীভাবে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় তার আদিমতা? এই আঁকড়ে ধরবার তাগিদ থেকেই বোধ হয় জন্ম নিয়েছিল এক সাহিত্য পত্রিকা, যার ভিনদেশি সম্পাদকের আফ্রিকান প্রেম ছুঁয়ে গেছে মানুষের মন। যে পত্রিকা বলে গিয়েছে আফ্রিকানদের কথা, তাঁদের আশা- আকাঙখা, কৃষ্টি- ঐতিহ্য, সমাজ- চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস।


' ব্ল্যাক অরফিয়াস : আ জার্নাল অফ আফ্রিকান অ্যান্ড অ্যাফ্রো- আমেরিকান লিটারেচার ' সম্ভবত আফ্রিকার মাটিতে প্রকাশিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লিটল ম্যাগাজিন। পত্রিকার নাম হঠাৎ ' ব্ল্যাক অরফিয়াস ' কেন? ১৯৫৭ তে যখন জার্মান সম্পাদক ও অনুবাদক উল্লি বেইয়ার প্রকাশ করতে উদ্দত হয়েছেন তাঁর পত্রিকা, তখনও তিনি তাঁর অন্যতম প্রিয় সাহিত্যিক জঁ পল সার্তের লেখা প্রবন্ধ ' Orphee Noir ' এর পাঠ- উন্মাদনা থেকে পুরোপুরি ভাবে মুক্ত হতে পারেন নি। এই Orphee Noir শীর্ষক প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় এক ফ্র‍্যাঙ্কোফোন আফ্রিকান প্রবন্ধ সংকলনে, যার সম্পাদনা করেন লিওপোল্ড সেঙ্ঘর। নাইজেরিয়ায় শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত বেইয়ার তখন মন্ত্রমুগ্ধ আফ্রিকার ইয়োরোবা সংস্কৃতির প্রতি, চাইছেন এমন একটি মাধ্যম যা নাইজেরিয়ান লেখকদের পৌঁছে দেবে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে। ব্ল্যাক অরফিয়াস হয়ে উঠলো সেই আন্তর্জাতিক উড়ান। অ্যাঙ্গলোফোনিক হোক অথবা ফ্রাঙ্কোফোনিক প্রত্যেক লেখকই সামিল ব্ল্যাক অরফিয়াসের মঞ্চে। পত্রিকায় তখন কলম ধরছেন নাইজেরিয়ার চিনুয়া আচেবে, ক্যামেরা লায়ে, ইজিকিয়েল ফালেলে, গেব্রিয়েল ওকারা, লেনবি পিটারস ও ওল সোয়েঙ্কা। রয়েছেন লিয়ং দামাস ও জর্জ লামিংও।




 
যে আফ্রিকান জনমানসে তখন ঔপনিবেশ বিরোধি প্রবল হাওয়া সেই সমাজের শুধু সম্ভ্রান্তেরাই নন, সাধারণ মধ্যবিত্ত পাঠকও উদাত্ত চিত্তে গ্রহণ করেছেন এক ইয়োরোপীয় সম্পাদকের আফ্রিকান প্রেম। পত্রিকা প্রকাশের তিন বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৯৬০ এ বেইয়ার আর একা নন, সম্পাদকীয় দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিতে দেখা যাচ্ছে ( নাইজেরিও বংশদ্ভূত) সোয়িঙ্কা ও ( দক্ষিণ আফ্রিকার বংশদ্ভূত) ফালেলেকে। এছাড়াও সম্পাদকমণ্ডলীতে লেখা হচ্ছে আইম সিজার ও লিওপোল্ড সেঙ্ঘরের নাম।


১৯৫৭ থেকে ১৯৬৭, এই দশ বছরের সময়কালে প্রকাশিত হয়েছে ব্ল্যাক অরফিয়াসের ২২ টি সংখ্যা। ১৯৬৮ তে ৩ টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়ে সাময়িকভাবে অনিয়মিত হয়ে পড়ে এই কাগজ। ফিরে আসে ১৯৭০ এ মোট ৪ টি সংখ্যা নিয়ে। ১৯৭০ পরবর্তী সময়ে আর কেউ কোনোদিন ব্ল্যাক অরফিয়াস প্রকাশের প্র‍য়াস একেবারেই করেন নি এমন দাবি করা না গেলেও এখনো পর্যন্ত পরবর্তীতে কোনো সংখ্যা প্রকাশের হদিস পাওয়া যায় নি।







বিভিন্ন সময়ে ব্ল্যাক অরফিয়াস কে নিয়ে অ্যাকাডেমিক পরিসরে বহু গবেষণাই হয়েছে। এমনকি আফ্রিকার মাটিতে প্রকাশিত প্রথম সারির বাণিজ্যিক পত্রিকাও অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করেছে লিটল ম্যাগাজিন ' ব্ল্যাক অরফিয়াস ' বিষয়ক আলোচনা। আমার এই ছোট্টো প্র‍য়াস কোনো গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ লেখবার অভিপ্রায়ে একেবারেই নয়। সহজ ভাষায় বাংলার পাঠককে আফ্রিকান লিটল ম্যাগাজিনের প্রতি আকৃষ্ট করাই  একমাত্র উদ্দেশ্য।





 
ব্ল্যাক অরফিয়াসের সমৃদ্ধি শুধুমাত্র তার সাহিত্যে নয়, পত্রিকার প্রচ্ছদে, অলংকরণে দেখা যায় আফ্রিকান লোকশিল্পের এক অনবদ্য রূপ। ১৯৫৭ তে প্রকাশিত আত্মপ্রকাশ সংখ্যার প্রচ্ছদটি করেছিলেন, বেইয়ারের প্রথম স্ত্রী, অস্ট্রিয়ান শিল্পী সুসেন ওয়েঙ্গার, যিনি ১৯৫০ এ বেইয়ারের সঙ্গে নাইজেরিয়া আসেন। আসবার অব্যবহিত পর ওয়েঙ্গার আক্রান্ত হন টিউবারকিউলসিসে এবং নিরাময়ের পদ্ধতি হিসেবে বেছে নেন আফ্রিকান ইয়োরোবা ধর্মীয় প্রথা। শুনতে অবাক লাগলেও তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন আর কে বলতে পারে যে এখান থেকেই তৈরি হয়নি বেইয়ারের ইয়োরোবা প্রীতি? তবে কিছুদিনের মাথায় তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। ১৯৬৬ তে যখন নাইজেরিইয়াতে শুরু হলো বায়াফ্রান যুদ্ধ, বেইয়ার তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী জর্জিনা বেটস কে নিয়ে ফিরে যান ইয়োরোপ। অপরদিকে ওয়েঙ্গার নাইজেরিয়ার মাটি আমৃত্যু ছাড়েননি। পরবর্তীতে তাঁকে ইয়োরোবা ধর্মীয় প্রথার উপদেশক হিসেবে পাওয়া যায় যিনি একই সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ওসোগবো অঞ্চলের আর্টিস্ট কো- অপারেটিভে।


ব্ল্যাক অরফিয়াসের প্রচ্ছদ হলো বিশ্বমানের। ওয়েঙ্গার সারা আফ্রিকা ঘুরে সংগ্রহ করেছিলেন লোকশিল্প আর নিজস্ব মুন্সিয়ানায় প্রচ্ছদে প্র‍য়োগ করেছেন লোক- শিল্পের মোটিফ। প্রথম আটটি প্রচ্ছদে দেখা যায় আফ্রিকান মূর্তির প্রয়োগ যার ঠিক পরেই তিনি শুরু করেন প্রচ্ছদ নিয়ে পরীক্ষা- নীরিক্ষা। এক একটি প্রচ্ছদে খুব বড়ো জোর দু'টো কী তিনটে রঙের প্রয়োগ, ছাপা হতো স্ক্রিন প্রিন্টে।






আর ভেতরের প্রতিটি পাতায় থাকতো সেট টাইপ, লেখা ও অলংকরণ ছাপাবার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে মেটাল ব্লক ও অফসেট প্রিন্টিং এর কম্বিনেশন। নামাঙ্কণ ছিল সুসেন ওয়েঙ্গারের হাতেই আঁকা। পত্রিকা ছেপে বেরুতো লাগোসের টাইম প্রেস থেকে । প্রথম তিন বছর প্রকাশক হিসেবে শিক্ষা দপ্তর, নাইজেরিয়া সরকারের নাম দেখা গেলেও ১৯৬০ এর থেকে প্রকাশক হিসেবে পাওয়া যায় বারি ( Mbari) ক্লাবের নাম।





শিল্পকলার প্রতি যে বেইয়ারের বিশেষ অনুরাগ ছিল তা ফুটে ওঠে বেশ কিছু সংখ্যায় প্রকাশিত হাফ- টোনে ছাপা আঁকার ছবি থেকে।









বর্তমানে ব্ল্যাক অরফিয়াসের অরিজিনাল কপি সংগ্রহ করতে চাওয়ার প্রচেষ্টা কিছুটা বামন হয়ে চাঁদ ধরবার মতো। পাওয়া যে অসম্ভব তা নয় কিন্তু কদাচিৎ যদি দেখাও মেলে বিক্রেতারা দাম হাঁকেন ৫০ থেকে ৬০ ডলারের কাছাকাছি। সংখ্যাগুলি যে খুব মোটাসোটা হতো তাও নয়। ৫০ থেকে ৬৪ পাতার মধ্যেই ঘোরাফেরা। ব্ল্যাক অরফিয়াসে প্রকাশিত গল্প নিয়ে পরবর্তীতে বেইয়ারের সম্পাদনাতেই প্রকাশিত হয়েছে দুটি সংকলন, প্রথমটির নাম ' Political Spider ' ও দ্বিতীয়টি ' Black Orpheus' নামেই। দু'টি সংকলনের প্রচ্ছদ শিল্পী বেইয়ারের দ্বিতীয় স্ত্রী জর্জিনা আর প্রকাশক ছিলেন হেইনম্যান।






 






Comments