|| কাইসার - ই - হিন্দ : মহামারি কালের এক সাময়িক পত্র ||
সুশোভন রায়চৌধুরী
![]() |
| কাইসার-ই-হিন্দ এর মাস্ট হেড |
কাইসার-ই- হিন্দ এর ইংরেজি তর্জমা করলে দাঁড়ায় 'দ্য এম্পারর অফ ইন্ডিয়া '। ১ জানুয়ারি, ১৮৮২ তে বম্বেতে অবস্থিত কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা ফিরোজশাহ মেহেতার আত্মীয় ফ্রামজি কাওয়াসী মেহেতা প্রতিষ্ঠা করেন, প্রতি রবিবারে প্রকাশিত এই সাপ্তাহিকের। আত্মপ্রকাশ সংখ্যার সম্পাদকীয় থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় পত্রিকার উদ্দেশ্য। তিনি এই পত্রিকার মাধ্যমে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে, যার প্রতিপাদ্য বিষয় হয়ে উঠবে খবর। ১৮৮৫ তে যখন বম্বেতে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন বসে, কাইসার-ই- হিন্দ কে দেখা যায় সেই অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তের সমর্থনে। আত্মপ্রকাশ থেকেই পত্রিকাটি গুজরাটি- ইংরেজি দ্বিভাষিক ছিল না। এই দ্বিভাষিক হিসেবে যাত্রা শুরু ১৮৯০ এর দশকে, যেখানে মোট ২৪ পাতার মধ্যে প্রথম তিন থেকে চার পাতায় থাকতো ইংরেজি ও বাদ বাকি গুজরাটি।
![]() |
| পত্রিকায় প্রকাশিত গুজরাটি লিপি |
বম্বের পত্রিকার ইতিহাসে বাইলিঙ্গুয়াল এপ্রোচ নতুন নয়। মারাঠি ও ইংরেজি ভাষার প্রথম দ্বিভাষিক পত্রিকা ' বম্বে দর্পণ' এর প্রকাশ সেই ১৮৩২ এই। এরপর ১৮৩৪ এ প্রকাশিত হতে দেখা যায়, পারশিদের পত্রিকা, উর্দু ও ইংরেজি দ্বিভাষিক ' আইনা-ই-সিকন্দর '। ১৮৯০ এর দশকে বম্বের ভাষা ও সংস্কৃতির নিরিখে বহুত্ববাদী সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছোতে সম্পাদনার একটি সহজ পন্থা হয়ে ওঠে বাইলিঙ্গুয়ালিজম। এই দশকে দ্বিভাষিকতা থেকে একধাপ এগিয়ে ত্রিভাষিক পত্রিকাও খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন ' বাহার-এ-রোজগার ' ( ১৮৯৩) যা ছিল পারশি, গুজরাটি ও উর্দুর ত্রিভাষিক। আবার গোয়াতে প্রকাশ পেয়েছে ' A Luz semenario politico,litteracio e noticioso ( ১৮৯০) যা ছিল পর্তুগীজ, কোঙ্কানি ও ইংরেজির ত্রিভাষিক পত্রিকা।
১৮৯৬ এর জুলাই মাসটা, বম্বের বাকি বছরগুলোর থেকে আলাদা কিছু ছিল না। তুমুল বৃষ্টি, আর বৃষ্টির ফলে সমস্ত রেললাইনে জল জমে রেল পরিষেবা ব্যাহত হওয়া বম্বের এক প্রাচীন ঐতিহ্য। কিন্তু এই বছর এমন কিছু ঘটলো, যা বম্বে আগে কখনো দেখে নি। ১৯ জুলাই ১৮৯৬ এর সংখ্যায় দেখা গেল, কলকাতার এসপ্ল্যানেডে অবস্থিত হোটেল ওয়াটসনে প্রদর্শিত সিনেমার বিজ্ঞাপন, যার টিকিট বিক্রির দায়ীত্ব ফ্রামজির মালিকানাধীন সানডে এন্ড কোম্পানির হাতে।
প্রকাশিত হয়েছে বম্বের আঞ্চলিক নাট্যদল ভিকটোরিয়া নাটক মণ্ডলীর মঞ্চস্থ নাটক ' গুল বাকাওয়ালী ' ও পারশি নাটক মণ্ডলী মঞ্চস্থ নাটক ' জাহাঙ্গীরশাহ ' এর বিজ্ঞাপন। জুলাই পেরিয়ে আগস্ট। বম্বের বন্দরে পা রাখলেন এক গুজরাটি আইনজীবী, যাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম শ্রেণির রেল বগিতে উঠতে বাধা দেওয়া হয়েছে বর্ণবিদ্বেষের কারণে। নাম, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। উত্তাল হয়ে উঠলো ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী রাজনীতির প্রেক্ষাপট। এই শিল্প সংস্কৃতি ও রাজনীতির ডামাডোলে সম্পাদক খেয়ালই করলেন না, বম্বের শশ্মানে, কবরস্থানে লেগে গিয়েছে মৃতদেহের লাইন।
প্রকাশিত হয়েছে বম্বের আঞ্চলিক নাট্যদল ভিকটোরিয়া নাটক মণ্ডলীর মঞ্চস্থ নাটক ' গুল বাকাওয়ালী ' ও পারশি নাটক মণ্ডলী মঞ্চস্থ নাটক ' জাহাঙ্গীরশাহ ' এর বিজ্ঞাপন। জুলাই পেরিয়ে আগস্ট। বম্বের বন্দরে পা রাখলেন এক গুজরাটি আইনজীবী, যাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম শ্রেণির রেল বগিতে উঠতে বাধা দেওয়া হয়েছে বর্ণবিদ্বেষের কারণে। নাম, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। উত্তাল হয়ে উঠলো ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী রাজনীতির প্রেক্ষাপট। এই শিল্প সংস্কৃতি ও রাজনীতির ডামাডোলে সম্পাদক খেয়ালই করলেন না, বম্বের শশ্মানে, কবরস্থানে লেগে গিয়েছে মৃতদেহের লাইন।
আগস্ট মাসের প্রথম সংখ্যায় কলেরা, স্মল পক্স ও জ্বরে কিছু মানুষের মৃত্যুসংবাদ ছাপা হলেও, সেই খবরের উপস্থাপনে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কারণ তখন ভারতীয়দের মর্টালিটি রেট মাত্র ৩০ বছর! সামান্য জ্বরে আক্রান্ত হয়ে যদি কিছু মানুষ মারাও যায়, তাকে জার্নালিজমের দুনিয়ায় 'সেনসেশনাল / ব্রেকিং নিউজ' বলে ধরা হতো না। ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৬ কাইসার - ই- হিন্দ এর ভেতরের পাতায় প্রথম উল্লিখিত হলো, ' বম্বে প্লেগ ' এর খবর। লেখা হলো--
" During the week alarming reports has gone from various quarters as to the existence of what is popularly called " bubonic fever " in the Mandevi district where 'hundreds' are already said to have fallen victims to the said disease. Three medical practitioners are said to have treated some of their patients..."
এই তিন চিকিৎসকের মধ্যে একজন ছিলেন ডা. এ.সি.ভেইগাস, যাঁকে এই প্লেগের আবিষ্কর্তা বলে ধরা হয়।
![]() |
| বম্বে পৌরসভার সামনে নির্মিত ডা। ভেগাস-এর মূর্তি |
প্লেগ শুরু হতেই বম্বের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে শহর ছাড়তে শুরু করলেন, ফলে চাপ পড়লো ছাপাখানার ওপরেও। জানুয়ারি, ১৮৯৭ তে দেখা গেল বহু পত্রিকা ও প্রেস বন্ধ হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় বেশ কিছুদিন বম্বে থেকেই কাইসার-ই হিন্দ প্রকাশিত হলেও, কর্মী ও সামাজিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে বন্ধ করতে হলো প্রেস। কিন্তু সম্পাদকও দমে যাওয়ার পাত্র নন। সেই সময়ে গরমকাল পড়লে ব্রিটিশ সাহেবেরা ঘুরতে যেতেন পাহাড়ে, ঠিক তেমনই বম্বের উচ্চবিত্ত পরিবারেরা গরমে যেতেন বম্বে থেকে ২২ কি.মি. দূরত্বে অবস্থিত এক শৈল শহর মাথেরানে। সম্পাদক ফ্রামজি এই মাথেরানে তৈরী করে রাখা তাঁর বাংলোতে পৌঁছোলেন, যেখান থেকে সেই অঞ্চলের মানুষের জন্যে একটি আঞ্চলিক পত্রিকা ' মাথেরান জটিংস' প্রকাশ করতেন ১৮৯২-৯৩ পর্যন্ত। সেখানে ছিল তাঁর নিজস্ব প্রেস। মহামারীকালে কাইসার -ই- হিন্দ ছাপার কাজ শুরু হলো মাথেরানে। তখন লেটার প্রেসের যুগে, ইংরেজি লেটার প্রেসে ছাপা হলেও, বম্বেতে গুজরাটি ছাপা হতো ম্যানুয়াল ব্লক তৈরী করে। তাই মাথেরানে দক্ষ কারিগরের অভাবে, গুজরাটি টাইপ সেটিং এ সমস্যা দেখা দেয়।
তাঁর লেখনি গর্জে ওঠে সরকারের বিরুদ্ধে। তিনি লেখেন --
" The plage is running its terrific course, uncontrolled and unsubdued and yet neither the Government of India nor the Government of Bombay has done its duty in attempting to stamp it out. From the little that has been done,it would seem that neither Government has in anyway realized the full gravity of the calamity that has befallen Bombay and her citizens."
![]() |
| স্যানিটাইজ করা হচ্ছে বম্বের রাস্তাঘাট |
আজকের এই করোনা মহামারীর কালে দাঁড়িয়েও কথাগুলো কতটা প্রাসঙ্গিক!
১৯১৪ সালে ফ্রামজি মেহেতা স্বেচ্ছাবসর গ্রহণ করেন এবং তাঁর পত্রিকা কাইসার - ই- হিন্দ বিক্রি করে দেন ইরাকসাউ রুস্তমজি জিরজিবেহেদিনের কাছে। এই ইরাকসাউয়ের সম্পাদনাতেই ১৯৩০ এর দশকে দু'টি বার্ষিক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগ নেয় এই পত্রিকা। পারশি ' নওরোজ ' উপলক্ষে এঙ্গলো- গুজরাটি সংখ্যা এবং সর্বভারতীয় বিশেষ সংখ্যা ( যা শুধুমাত্র ইংরেজিতে)। এই ১৯৩০ এর সর্বভারতীয় বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জওহরলাল নেহেরু ও এনি বেসান্তের লেখা।








Comments
Post a Comment