|| হাসপাতালে লিটল ম্যাগ ||

সুশোভন রায়চৌধুরী 

লিটল ম্যাগাজিন জনিসটাই এমন যে তার জন্ম ঠিক কোথায় হতে পারে বা কোথায় নয়, বলা মুশকিল। চায়ের দোকান থেকে কলেজ ক্যান্টিন, ব্যক্তিগত তাগিদ হোক বা গোষ্ঠীগত চাহিদা, কোনো না কোনো ভাবে পত্রিকার প্রকাশ ঠিক ঘটেই যায়। তবে যদি বলি পত্রিকার জন্ম হচ্ছে হাসপাতালে? একটু ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার মতো তাই না? হ্যাঁ। আমাদের আলোচনার বিষয় এমন একটি পত্রিকা যার আত্মপ্রকাশ হাসপাতালেই। ধরুন, যদি বলি হাসপাতালের ভিজিটিং আওয়ার্সে বিভিন্ন রোগীর আত্মীয়- পরিজন আসেন, তাঁদের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হয়, তৈরি হয় বন্ধুত্ব। আর হাসপাতাল চত্বরের বন্ধুত্ব থেকে অঙ্কুরিত হয় লিটল ম্যাগ প্রকাশের উদ্যোগ, তাহলে কি অবিশ্বাস্য শোনাবে? অবিশ্বাস্য না হলেও আমরা যে পত্রিকার কথা জানতে চলেছি তার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি খাটে না। এবার ধরুন, একটি হাসপাতালের ডরমিটরিতে সাজানো সারি সারি রোগীদের বেড, আর বেডে শায়িত যে কোনো দুই রোগীর মধ্যে হয়ে পড়লো বন্ধুত্ব? তাঁরা শারীরিক নয়, মানসিক রূপে অসুস্থ? দুই বন্ধুর একজন হলো কবি যে প্রভাবিত করলো অপর বন্ধুকে হাসপাতালের বেডে বসেই কবিতা লিখতে? দু' জন মিলে প্রকাশ করলেন পত্রিকা আর পত্রিকা সূত্রেই যুক্ত হলেন আরও আরও রোগী? এটাও কি অবিশ্বাস্য? না। ঠিক এরকমই ঘটেছিল এডিনবার্গে অবস্থিত ক্রেইগলকহার্ট যুদ্ধ হাসপাতালে!

দ্য হাইড্রা- র প্রচ্ছদ 

 
ঠিকই ধরেছেন। আমরা বলছি ' দ্য হাইড্রা : দ্য ম্যাগাজিন অফ ক্রেইগলকহার্ট ওয়ার হসপিটাল ' - এর কথা। সাল ১৯১৭। সদ্য শেষ হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ব্রিটিশ সেনাবাহিনির বহু সৈন্যই তখন ক্লান্ত- বিদ্ধস্ত যাঁদের মধ্যে অনেকেই আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসর্ডারে। এই মানসিক অবসাদে আক্রান্ত সেনাদের তখন একমাত্র আস্তানা ক্রেইগলকহার্ট ওয়ার হসপিটাল। এরকমই দু' ই অবসাদগ্রস্ত সেনা কর্তার দেখা হলো হাসপাতালের বেডে। প্রথম জন সিগফ্রুড স্যাসুন যিনি পেশায় সেনা ও নেশায় কবি এবং দ্বিতীয় জন উইলফ্রেড ওয়েন। সিগফ্রুড তখন কল্পনার জগতে বিরাজমান। হ্যারি পটারের হগওয়ার্টস এর মতো এক কল্পজগত দেখে বেড়াচ্ছেন হাসপাতালের ঘরে। হাসপাতাল তখন তাঁর কাছে এক কল্পনগরী --- নাম দিয়েছেন 'ডটিভিলে '! মান্সিক অবসাদের চরম সীমায় পৌঁছোলেও কবিতা লেখা তিনি ছাড়েন নি। পাশের বেডের বন্ধু ওয়েনকে ক্রমাগত উদ্বুদ্ধ করছেন কবিতা লিখতে আর ওয়েনও বাধ্য ছাত্রের মতোই অদক্ষ হাত হলেও লিখে চলেছেন কবিতা। লেখা তো হচ্ছে, কিন্তু পাঠক কোথায়? অগত্যা ওয়েন প্রকাশ করলেন ' দ্য হাইড্রা ' নামের এক পত্রিকা, যেখানে হাসপাতালের রোগীরা তুলে ধরবেন তাঁদের সাহিত্য ও শিল্প, পড়বেন একে অপরে। ওয়েনের সম্পাদনাতেই ১৯১৭ তে প্রকাশিত হলো ছ' টি সংখ্যা।


বাঁদিকে সিগফ্রুড স্যাসুন ও ডান দিকে উইলফ্রেড ওয়েন

 

ছোটোবেলা থেকে এই যে আমরা জীবনবিজ্ঞান পড়ে এসেছি, অসুখ বিসুখ হলে গিয়েছি চিকিৎসকের কাছে -- তার থেকে একটি বিষয় কিন্তু পরিষ্কার। জীবনবিজ্ঞান হোক অথবা মেডিকেল সায়েন্স, পরিভাষার ক্ষেত্রে ইংরেজির তুলনায় লাতিন শব্দের প্রয়োগটাই বেশি! পত্রিকার নামটাই ধরা যাক, ' হাইড্রা' ও তো লাতিন শব্দ যার অর্থ জল? আবার ক্রেইগলকহার্ট হাসপাতালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হওয়ার আগে রোগীদের রোগ নিরাময়ের এক পদ্ধতি ছিল ' হাইড্রোথেরাপি '। সম্পাদক ওয়েন পত্রিকার নাম ঠিক কী ভেবে রেখেছিলেন বোঝা মুশকিল। কারণ আপাত দৃষ্টিতে জলের মতো শান্ত- স্থবির সাহিত্য তাঁর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি, প্রচ্ছদেও দেখা গিয়েছে গ্রীক মাইথোলজির বিভৎস সব চরিত্রের ছবি!



এক বছরের মাথাতেই ওয়েন মারা যান। তবে ১৯১৮ তে জর্জ হেনরি বোনার নামের এক সেনা কর্তা সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যিনি কিছুদিন আগেই ভর্তি হয়েছেন নিউরোসথেনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে। বোনার পরবর্তীতে সুস্থ হয়ে বেছে নেন সাংবাদিকতার পেশা। ১৯১৮ তে প্রকাশিত ' দ্য হাইড্রা' র একটি সম্পাদকীয় থেকে যানা যাচ্ছে, " the exigency of the service have taken from us Mr.Sassoon ".



পত্রিকাটি পড়তে গেলে মনে হবে আমরা কোনো স্কুল বা কলেজ ম্যাগাজিন পড়ছি। লেখার ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে স্বতঃস্ফূর্ততা, আছে হাস্যরসের উপাদানও। প্রকাশিত হয়েছে বিতর্ক, সাহিত্য, মুরগির খামার তৈরি বিষয়ক আর্টিকেল, খেলাধুলো, ফোটোগ্রাফি এবং গার্ডেনিং এর মতো বৈচিত্রপূর্ণ বিষয় --- যেগুলির লেখক নিঃসন্দেহে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, যুদ্ধ- বিদ্ধস্ত, মানসিক অবসাদে আক্রান্ত কিছু মানুষ।


জানুয়ারি, ১৯১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত Anateus বিষয়ক অলংকরণ

 

জানুয়ারি, ১৯১৮ - র সম্পাদকীয়তে বোনার লেখেন, " Our Editor Mr.Owen has reduced the Anateus Saga to blank verse.This poem we hope to print in our next number." এই Anateus হলো গ্রীক মাইথোলজির একটি চরিত্র, যাকে নিয়ে ওয়েন কবিতা লিখেছিলেন, যদিও পরবর্তী কোনো সংখ্যায় উল্লিখিত কবিতাটি ছাপা হতে দেখা যায় নি। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক উইলফ্রেড ওয়েনের শেষ তম লেখা, ' দ্য হাইড্রা' তে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর মৃত্যুর পর, জানুয়ারি, ১৯১৮ সংখ্যায়। লেখাটি ছিল গ্রীক মাইথোলজির Anateus কে নিয়েই। তিনি লেখেন, " Now surely every officer who comes to Craiglockhart recognises that in a way,he is himself Anateus who has been taken from his Mother Earth and well- neigh crushed to death by the war giant or military machine...Anateus typifies the occupation cure at Craiglockhart.His story is the justification of our activities."


বোনার

Comments