।। লাদাখে প্রকাশিত প্রথম তিব্বতি ভাষার সাময়িকী।।
সুশোভন রায়চৌধুরী
এ. এইচ. ফ্রাঙ্কির নাম আমরা পাই লাদাখ ও লাহুলের ইতিহাস, ভাষা ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক গবেষণায়। তাঁর লেখা, লন্ডন থেকে ১৯০৭ এ প্রকাশিত ' A History of Western Tibet ' কিংবা কলকাতা থেকে ১৯১৪ সালে প্রকাশিত ' The Antiquities of Indian Tibet ' বই দুটি ক্লাসিকের পর্যায় চলে গিয়েছে। তবে মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে তাঁর মাতৃভূমি জার্মানি থেকে ভারতে এসেছিলেন খ্রিষ্টান মিশনারি হয়ে, আর সেদিক থেকে দেখলে তিব্বতি ভাষায় তাঁর অনুদিত বাইবেল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আমাদের আলোচ্য বিষয় সাময়িকীর সম্পাদক ফ্র্যাঙ্কি ও তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা।
ফ্রাঙ্কির জন্ম জার্মানির সিলেসিয়াতে যিনি ভারত-তিব্বত সীমানায় অবস্থিত লাদাখে পৌঁছোন ১৮৯৬ সালে। তাঁর আসবার চার দশক আগেই মোভারিয়ান মিশনারিরা লাদাখে পৌঁছে গিয়েছেন ধর্মীয় প্রচারে। এই মিশনারিদের ইচ্ছে ছিল লাদাখ অতিক্রম করে তাঁরা পৌঁছে যাবেন মোঙ্গোলিয়া। কিন্তু তিন বারের চেষ্টা বিফলে যাওয়ায় লাদাখের দু'ই পাহাড়ি গ্রাম কিল্যাঙ ও লাহুলেই ঘাঁটি গেড়ে বসেন। পাকাপাকি ভাবে ১৮৮৫ তে লেহ শহরে গড়ে তোলেন তাঁদের সদর দপ্তর। আর এ.এইচ. ফ্রাঙ্কি ১৮৯৯ তে দপ্তর খোলেন খালতসি নামের এক ছোট্টো পাহাড়ি গ্রামে।
প্রথম থেকেই এই মিশনারিরা তাঁদের প্রয়োজনীয় ছাপার কাজ চালাতেন নিজস্ব লিথোগ্রাফিক প্রেস থেকে। প্রথম তিব্বতি ভাষার প্রকাশনাও এই মিশনারিদের হাত ধরেই। ১৮৫৮ সালে এ.এইচ. জেস্কে অনুবাদ করেন তিব্বতি ভাষায় ওল্ড টেস্টামেন্ট যার প্রকাশও এই একই বছরে। এরপর বাইবেল থেকে শুরু করে শিশু পাঠ্য বই, মহাকাশ চর্চার বই, কোনো কিছুই বাদ যায় নি। প্রথম ইংরেজি- তিব্বতি অভিধানের প্রকাশ ১৮৬৬ তে। যদি ধর্মীয় বইপত্রের নিরিখে এ. এইচ. ফ্রাঙ্কির অবদান দেখতে হয়, তাহলে উল্লেখ করতে হবে ' Skyabs mgon Yeshu ' বইটির কথা যা প্রচলিত স্ট্যান্ডার্ড তিব্বতি ভাষাকে অনুসরণ না করে লেহ অঞ্চলের ডায়ালেক্টে লেখা। এছাড়াও তিনি প্রকাশ করেছেন তিব্বতি প্রবচন, লোক গল্প। পাথরে খোদাই তিব্বতি লেখা উদ্ধার করে, কাগজে ছেপে পাঠিয়েছেন ইয়োরোপ সংরক্ষণের জন্যে। ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ছাপা বহু লিফলেট পরে স্থান পেয়েছে তাঁর ' Antiquities of Indian Tibet ' গ্রন্থে।
১৯০৪ সালে এ. এইচ. ফ্রাঙ্কির হঠাৎ মাথায় এল, একটি সাময়িকী প্রকাশের কথা। ছাপলেনও। নাম ' La dvags kyi akhbar ' এককথায় ' লাদাখ সংবাদ '। পত্রিকার নামে ' সংবাদ ' শব্দটি থাকলেও ফ্রাঙ্কির উদ্দেশ্য কোনো সংবাদপত্র প্রকাশ ছিল না। তাঁর ইচ্ছে, পত্রিকাটি হবে শিক্ষামূলক, চরিত্রে হবে সেক্যুলার, অন্তত লাদাখের তিব্বতি ভাষায় হাতে লিখে প্রকাশিত প্রায় সমস্ত বইতে যে বৌদ্ধ ধর্মের আধিপত্য, তাঁর পত্রিকা হবে সেই আধিপত্য থেকে মুক্ত। তিনি লক্ষ করেছিলেন, সেই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বই পড়া ছিল শুধুমাত্র ধর্মীয় জ্ঞান আহরণের মাধ্যম। তাঁরা নিছক মনোরঞ্জনের জন্যে বা সময় কাটানোর উপকরণ হিসেবে বইকে ধরতেন না। তিনি ভেবেছিলেন অন্ততঃ পত্রিকা কেউ ধর্মীয় ভাবনা নিয়ে পড়বেন না। তাঁর পত্রিকার সেক্যুলার চরিত্রটিকে বোঝাতে নিলেন এক অভিনব পন্থা। পত্রিকায় ব্যবহার করলেন কার্সিভ তিব্বতি ফন্ট। কারণ ' ইউ চেন ' তিব্বতি ফন্ট তখন বৌদ্ধ - খ্রিষ্টান নির্বিশেষে ব্যবহার করছেন ধর্মীয় বই ছাপাতে। একই সঙ্গে তিব্বতি ভাষার ঐতিহ্যবাহী ব্যাকরণ ও বানানবিধিকে অক্ষত রেখে শুরু করলেন কথ্য ভাষা ও ডায়ালেক্টের ব্যবহার। পত্রিকা ছিল চার পাতার, যার লেখাগুলো বিভক্ত ছিল তিনটে ভাগে। প্রথম বিভাগে প্রকাশিত হতো ' বিশ্ব সংবাদ ' যেখানে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রের নির্বাচিত কিছু খবর তিনি তুলে ধরতেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই কোনো ইয়োরোপীয় ব্যক্তি বা ব্রিটিশ রাজ সম্পর্কিত কোনো খবরে গ্রাম্য তিব্বতিরা আগ্রহ দেখাতেন না। তাঁদের আগ্রহের বিষয় ছিল লাদাখ ও লাদাখের মানুষ।
১৯০৪ সালে এই বিভাগের একটা খবর খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। খবরটি ছিল তিব্বতি মেয়েদের জন্যে বর খোঁজার একটি দল গঠন করেছেন লেহ 'র বাসিন্দারা। আবার ফ্র্যাঙ্কির একটি সম্পাদকীয় থেকে উঠে আসে তাঁর পত্রিকা মাঝে পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে বসেছিল, ব্রিটিশ জওয়ানদের হাতে তিব্বতি গ্রাম বাসীর খুন হওয়ার খবর ছাপানোকে কেন্দ্র করে। তবে কিছুদিনের মাথায় তাঁদের ভ্রান্তি কাটে কারণ তাঁরা খবর পান, সিমলার জেলে বিনা অপরাধে আটক রাখা হয়েছে কিছু তিব্বতিকে।
এখন মুশকিল হলো সম্পাদক এ. এইচ. ফ্র্যাঙ্কি তিব্বতি ভাষা যে খুব ভালো শিখে গিয়েছিলেন তা নয়। ফলে 'বিশ্ব সংবাদ ' বিভাগের জন্যে তাঁকে সাহায্য নিতে হতো আঞ্চলিক মানুষের। ফ্র্যাঙ্কি ভাঙাচোরা তিব্বতিতে কী বললেন, আর অনুবাদক কী বুঝে কী লিখলেন, তার একটা মজার উদাহরণ দেখে নেওয়া যাক। ফ্র্যাঙ্কি জানালেন রুশ- জাপান যুদ্ধে সামুদ্রিক দ্বৈরথের কথা। যা শুনে তাঁর আঞ্চলিক অনুবাদক সমুদ্রকে ' নদী' তে পর্যবশিত করলেন। লিখলেন রুশ- জাপান যুদ্ধ হচ্ছে কাশ্মীরের সিন্ধু নদীতে! সেই সমস্যা সংশোধনের পরেও খবরটা পাঠকদের বোধগম্য হলো না। তাঁদের প্রশ্ন হলো, রুশ- জাপান যুদ্ধ হচ্ছে ভালো কথা, সে নিয়ে তাঁদের মাথা ব্যথা নেই কিন্তু ডাঙায় যুদ্ধ না করে সবাই জলে কেন গেল?
আবার অনেক সময়ে দেখা গিয়েছে সরকারি দুর্নীতির পর্দা ফাঁস হতে। সেই সময়ে লাদাখের পোস্টমাস্টার, পোস্টম্যানদের প্রকৃত বেতন ৫ টাকার পরিবর্তে কম দিয়ে সই করিয়ে নিচ্ছিলেন সম্পূর্ণ বেতন দেওয়া হয়েছে বলে। ফ্র্যাঙ্কি তাঁর পত্রিকায় নির্দিষ্ট ভাবে অভিযোগকারী ও অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করলেন না। আর পত্রিকার পাঠকেরা ভাবলেন, এটি বোধহয় কোনো রম্য রচনা প্রকাশিত হয়েছে! তো এই ছিল পাঠক- সম্পাদক সম্পর্ক।
'লাদাখ সংবাদ ' এর দ্বিতীয় বিভাগটি ছিল লাদাখীদের আঞ্চলিক লোক সাহিত্য ও লোক সংস্কৃতি নিয়ে। যদিও এক্ষেত্রে লাদাখের লোক সংগীত ও লোক গল্প প্রাধান্য পেয়েছে। যে বিষয়ে সম্পাদক ফ্র্যাঙ্কির অভিমত, লাদাখের তৎকালীন প্রবন্ধ সাহিত্যে বিষয় অথবা শব্দের রিপিটেশন চোখে পড়ার মতো। তাঁর কাছে লোক সংগীত ও লোক গল্প অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। অবশ্য তিনি একথাও স্বীকার করেছেন, পত্রিকাতে লোকজ উপাদানের অন্তর্ভুক্তির অন্যতম কারণ বিষয়ের প্রতি ইয়োরোপীয়দের আগ্রহ। একই সঙ্গে গল্পে সেনসর করেছেন সেই সমস্ত অংশ যার অনুমোদন খ্রিষ্ট ধর্ম দেয় না।
তৃতীয় ভাগটি যে সম্পূর্ণ ভাবে ধর্মীয় তা বলা যায় না। কারণ এই বিভাগে প্রকাশিত হতো ধর্মকে কেন্দ্র করে ব্যঙ্গাত্মক লেখা। লেখার শুরুতে ছাপা হতো লোক সংগ্রাহক ফ্র্যাঙ্কির সংগ্রহ থেকে একটি করে তিব্বতি প্রবচন। যেমন---
"If the Lama is himself not perfect,how can he guide the dying? "
La dvags kyi akhbar এর প্রথম সংখ্যা ছাপা হয়েছিল, ১৫০ কপি যা পরবর্তীতে নেমে দাঁড়ায় ৬০ কপিতে। এই ৬০ কপির মধ্যে ২০ কপি পাঠানো হতো পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং এ। পত্রিকা সার্কুলেশনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়ায় পার্বত্য অঞ্চলের ডাক ব্যবস্থা। যার সুরাহা করতে ফ্র্যাঙ্কি লেহ বাজারের এক পত্রিকা বিক্রেতাকে দেন অভিনব বুদ্ধি। তিনি বলেন, পত্রিকা বিক্রির বদলে ভাড়া দেওয়া শুরু করো। পাঠক পড়ে তোমাকে কপি ফেরত দেবে। সেই কপিটিই তুমি আবার অন্য কাউকে ভাড়া দেবে।
১৯০৬ সালে লাহুল থেকে এ.এইচ.ফ্রাঙ্কি স্থানান্তরিত হন কিল্যাঙে। পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব ছেড়ে দেন তাঁর সতীর্থ মিশনারির হাতে। ১৯০৭ এ নতুন সম্পাদক পত্রিকার নাম বদলে রাখেন ' La dvags pho nya ' বা ' লাদাখ হেরাল্ড ' যেখানে pho nya শব্দটির অর্থ পরীও বোঝায়। জানা যায় ১৯০৮ সালেই চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় তিব্বতি ভাষার প্রথম সাময়িকপত্র।
এ. এইচ. ফ্রাঙ্কির নাম আমরা পাই লাদাখ ও লাহুলের ইতিহাস, ভাষা ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক গবেষণায়। তাঁর লেখা, লন্ডন থেকে ১৯০৭ এ প্রকাশিত ' A History of Western Tibet ' কিংবা কলকাতা থেকে ১৯১৪ সালে প্রকাশিত ' The Antiquities of Indian Tibet ' বই দুটি ক্লাসিকের পর্যায় চলে গিয়েছে। তবে মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে তাঁর মাতৃভূমি জার্মানি থেকে ভারতে এসেছিলেন খ্রিষ্টান মিশনারি হয়ে, আর সেদিক থেকে দেখলে তিব্বতি ভাষায় তাঁর অনুদিত বাইবেল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আমাদের আলোচ্য বিষয় সাময়িকীর সম্পাদক ফ্র্যাঙ্কি ও তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা।
![]() |
| এ. এইচ. ফ্র্যাঙ্কি |
ফ্রাঙ্কির জন্ম জার্মানির সিলেসিয়াতে যিনি ভারত-তিব্বত সীমানায় অবস্থিত লাদাখে পৌঁছোন ১৮৯৬ সালে। তাঁর আসবার চার দশক আগেই মোভারিয়ান মিশনারিরা লাদাখে পৌঁছে গিয়েছেন ধর্মীয় প্রচারে। এই মিশনারিদের ইচ্ছে ছিল লাদাখ অতিক্রম করে তাঁরা পৌঁছে যাবেন মোঙ্গোলিয়া। কিন্তু তিন বারের চেষ্টা বিফলে যাওয়ায় লাদাখের দু'ই পাহাড়ি গ্রাম কিল্যাঙ ও লাহুলেই ঘাঁটি গেড়ে বসেন। পাকাপাকি ভাবে ১৮৮৫ তে লেহ শহরে গড়ে তোলেন তাঁদের সদর দপ্তর। আর এ.এইচ. ফ্রাঙ্কি ১৮৯৯ তে দপ্তর খোলেন খালতসি নামের এক ছোট্টো পাহাড়ি গ্রামে।
প্রথম থেকেই এই মিশনারিরা তাঁদের প্রয়োজনীয় ছাপার কাজ চালাতেন নিজস্ব লিথোগ্রাফিক প্রেস থেকে। প্রথম তিব্বতি ভাষার প্রকাশনাও এই মিশনারিদের হাত ধরেই। ১৮৫৮ সালে এ.এইচ. জেস্কে অনুবাদ করেন তিব্বতি ভাষায় ওল্ড টেস্টামেন্ট যার প্রকাশও এই একই বছরে। এরপর বাইবেল থেকে শুরু করে শিশু পাঠ্য বই, মহাকাশ চর্চার বই, কোনো কিছুই বাদ যায় নি। প্রথম ইংরেজি- তিব্বতি অভিধানের প্রকাশ ১৮৬৬ তে। যদি ধর্মীয় বইপত্রের নিরিখে এ. এইচ. ফ্রাঙ্কির অবদান দেখতে হয়, তাহলে উল্লেখ করতে হবে ' Skyabs mgon Yeshu ' বইটির কথা যা প্রচলিত স্ট্যান্ডার্ড তিব্বতি ভাষাকে অনুসরণ না করে লেহ অঞ্চলের ডায়ালেক্টে লেখা। এছাড়াও তিনি প্রকাশ করেছেন তিব্বতি প্রবচন, লোক গল্প। পাথরে খোদাই তিব্বতি লেখা উদ্ধার করে, কাগজে ছেপে পাঠিয়েছেন ইয়োরোপ সংরক্ষণের জন্যে। ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ছাপা বহু লিফলেট পরে স্থান পেয়েছে তাঁর ' Antiquities of Indian Tibet ' গ্রন্থে।
১৯০৪ সালে এ. এইচ. ফ্রাঙ্কির হঠাৎ মাথায় এল, একটি সাময়িকী প্রকাশের কথা। ছাপলেনও। নাম ' La dvags kyi akhbar ' এককথায় ' লাদাখ সংবাদ '। পত্রিকার নামে ' সংবাদ ' শব্দটি থাকলেও ফ্রাঙ্কির উদ্দেশ্য কোনো সংবাদপত্র প্রকাশ ছিল না। তাঁর ইচ্ছে, পত্রিকাটি হবে শিক্ষামূলক, চরিত্রে হবে সেক্যুলার, অন্তত লাদাখের তিব্বতি ভাষায় হাতে লিখে প্রকাশিত প্রায় সমস্ত বইতে যে বৌদ্ধ ধর্মের আধিপত্য, তাঁর পত্রিকা হবে সেই আধিপত্য থেকে মুক্ত। তিনি লক্ষ করেছিলেন, সেই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বই পড়া ছিল শুধুমাত্র ধর্মীয় জ্ঞান আহরণের মাধ্যম। তাঁরা নিছক মনোরঞ্জনের জন্যে বা সময় কাটানোর উপকরণ হিসেবে বইকে ধরতেন না। তিনি ভেবেছিলেন অন্ততঃ পত্রিকা কেউ ধর্মীয় ভাবনা নিয়ে পড়বেন না। তাঁর পত্রিকার সেক্যুলার চরিত্রটিকে বোঝাতে নিলেন এক অভিনব পন্থা। পত্রিকায় ব্যবহার করলেন কার্সিভ তিব্বতি ফন্ট। কারণ ' ইউ চেন ' তিব্বতি ফন্ট তখন বৌদ্ধ - খ্রিষ্টান নির্বিশেষে ব্যবহার করছেন ধর্মীয় বই ছাপাতে। একই সঙ্গে তিব্বতি ভাষার ঐতিহ্যবাহী ব্যাকরণ ও বানানবিধিকে অক্ষত রেখে শুরু করলেন কথ্য ভাষা ও ডায়ালেক্টের ব্যবহার। পত্রিকা ছিল চার পাতার, যার লেখাগুলো বিভক্ত ছিল তিনটে ভাগে। প্রথম বিভাগে প্রকাশিত হতো ' বিশ্ব সংবাদ ' যেখানে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রের নির্বাচিত কিছু খবর তিনি তুলে ধরতেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই কোনো ইয়োরোপীয় ব্যক্তি বা ব্রিটিশ রাজ সম্পর্কিত কোনো খবরে গ্রাম্য তিব্বতিরা আগ্রহ দেখাতেন না। তাঁদের আগ্রহের বিষয় ছিল লাদাখ ও লাদাখের মানুষ।
১৯০৪ সালে এই বিভাগের একটা খবর খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। খবরটি ছিল তিব্বতি মেয়েদের জন্যে বর খোঁজার একটি দল গঠন করেছেন লেহ 'র বাসিন্দারা। আবার ফ্র্যাঙ্কির একটি সম্পাদকীয় থেকে উঠে আসে তাঁর পত্রিকা মাঝে পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে বসেছিল, ব্রিটিশ জওয়ানদের হাতে তিব্বতি গ্রাম বাসীর খুন হওয়ার খবর ছাপানোকে কেন্দ্র করে। তবে কিছুদিনের মাথায় তাঁদের ভ্রান্তি কাটে কারণ তাঁরা খবর পান, সিমলার জেলে বিনা অপরাধে আটক রাখা হয়েছে কিছু তিব্বতিকে।
এখন মুশকিল হলো সম্পাদক এ. এইচ. ফ্র্যাঙ্কি তিব্বতি ভাষা যে খুব ভালো শিখে গিয়েছিলেন তা নয়। ফলে 'বিশ্ব সংবাদ ' বিভাগের জন্যে তাঁকে সাহায্য নিতে হতো আঞ্চলিক মানুষের। ফ্র্যাঙ্কি ভাঙাচোরা তিব্বতিতে কী বললেন, আর অনুবাদক কী বুঝে কী লিখলেন, তার একটা মজার উদাহরণ দেখে নেওয়া যাক। ফ্র্যাঙ্কি জানালেন রুশ- জাপান যুদ্ধে সামুদ্রিক দ্বৈরথের কথা। যা শুনে তাঁর আঞ্চলিক অনুবাদক সমুদ্রকে ' নদী' তে পর্যবশিত করলেন। লিখলেন রুশ- জাপান যুদ্ধ হচ্ছে কাশ্মীরের সিন্ধু নদীতে! সেই সমস্যা সংশোধনের পরেও খবরটা পাঠকদের বোধগম্য হলো না। তাঁদের প্রশ্ন হলো, রুশ- জাপান যুদ্ধ হচ্ছে ভালো কথা, সে নিয়ে তাঁদের মাথা ব্যথা নেই কিন্তু ডাঙায় যুদ্ধ না করে সবাই জলে কেন গেল?
আবার অনেক সময়ে দেখা গিয়েছে সরকারি দুর্নীতির পর্দা ফাঁস হতে। সেই সময়ে লাদাখের পোস্টমাস্টার, পোস্টম্যানদের প্রকৃত বেতন ৫ টাকার পরিবর্তে কম দিয়ে সই করিয়ে নিচ্ছিলেন সম্পূর্ণ বেতন দেওয়া হয়েছে বলে। ফ্র্যাঙ্কি তাঁর পত্রিকায় নির্দিষ্ট ভাবে অভিযোগকারী ও অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করলেন না। আর পত্রিকার পাঠকেরা ভাবলেন, এটি বোধহয় কোনো রম্য রচনা প্রকাশিত হয়েছে! তো এই ছিল পাঠক- সম্পাদক সম্পর্ক।
![]() |
| লাদাখের গ্রাম |
'লাদাখ সংবাদ ' এর দ্বিতীয় বিভাগটি ছিল লাদাখীদের আঞ্চলিক লোক সাহিত্য ও লোক সংস্কৃতি নিয়ে। যদিও এক্ষেত্রে লাদাখের লোক সংগীত ও লোক গল্প প্রাধান্য পেয়েছে। যে বিষয়ে সম্পাদক ফ্র্যাঙ্কির অভিমত, লাদাখের তৎকালীন প্রবন্ধ সাহিত্যে বিষয় অথবা শব্দের রিপিটেশন চোখে পড়ার মতো। তাঁর কাছে লোক সংগীত ও লোক গল্প অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। অবশ্য তিনি একথাও স্বীকার করেছেন, পত্রিকাতে লোকজ উপাদানের অন্তর্ভুক্তির অন্যতম কারণ বিষয়ের প্রতি ইয়োরোপীয়দের আগ্রহ। একই সঙ্গে গল্পে সেনসর করেছেন সেই সমস্ত অংশ যার অনুমোদন খ্রিষ্ট ধর্ম দেয় না।
![]() |
১৯০৪ এর অনেক পরে প্রকাশিত তিব্বতি ভাষার একটি হাতে লেখা পত্রিকা। প্রকাশিত কালিম্পং থেকে। ' লাদাখ সংবাদ' এর কোনো ছবি পাওয়া যায় না। |
এই বিভাগে কিছু পুনর্মুদ্রণও পাওয়া যায়, যেমন দেখা যাবে "La dvags Rgyal rabs " / লাদাখের রয়াল ক্রনিক্ল এর অংশ যা এককালে প্রভাবিত করেছিল তাঁর দেশজ দার্শনিক কার্ল মার্ক্সকে। ফ্র্যাঙ্কির মতে তাঁর পাঠকেরা এই নিরস পুনর্মুদ্রণ উপভোগ করতেন, কারণ তাঁরা ফিরে যেতেন সেই সময়ে যখন লাদাখ ছিল অবিভক্ত রাজত্ব। (ডোগরাদের অধিগ্রহণ ও পরবর্তীতে জম্মু-কাশ্মীরের তখনও সৃষ্টি হয়নি।)
![]() |
| গ্রাম্য শিশুরা |
তৃতীয় ভাগটি যে সম্পূর্ণ ভাবে ধর্মীয় তা বলা যায় না। কারণ এই বিভাগে প্রকাশিত হতো ধর্মকে কেন্দ্র করে ব্যঙ্গাত্মক লেখা। লেখার শুরুতে ছাপা হতো লোক সংগ্রাহক ফ্র্যাঙ্কির সংগ্রহ থেকে একটি করে তিব্বতি প্রবচন। যেমন---
"If the Lama is himself not perfect,how can he guide the dying? "
La dvags kyi akhbar এর প্রথম সংখ্যা ছাপা হয়েছিল, ১৫০ কপি যা পরবর্তীতে নেমে দাঁড়ায় ৬০ কপিতে। এই ৬০ কপির মধ্যে ২০ কপি পাঠানো হতো পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং এ। পত্রিকা সার্কুলেশনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়ায় পার্বত্য অঞ্চলের ডাক ব্যবস্থা। যার সুরাহা করতে ফ্র্যাঙ্কি লেহ বাজারের এক পত্রিকা বিক্রেতাকে দেন অভিনব বুদ্ধি। তিনি বলেন, পত্রিকা বিক্রির বদলে ভাড়া দেওয়া শুরু করো। পাঠক পড়ে তোমাকে কপি ফেরত দেবে। সেই কপিটিই তুমি আবার অন্য কাউকে ভাড়া দেবে।
১৯০৬ সালে লাহুল থেকে এ.এইচ.ফ্রাঙ্কি স্থানান্তরিত হন কিল্যাঙে। পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব ছেড়ে দেন তাঁর সতীর্থ মিশনারির হাতে। ১৯০৭ এ নতুন সম্পাদক পত্রিকার নাম বদলে রাখেন ' La dvags pho nya ' বা ' লাদাখ হেরাল্ড ' যেখানে pho nya শব্দটির অর্থ পরীও বোঝায়। জানা যায় ১৯০৮ সালেই চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় তিব্বতি ভাষার প্রথম সাময়িকপত্র।






Comments
Post a Comment