|| হারলেম রেনেসাঁস ||

সুশোভন রায়চৌধুরী

আমেরিকার মাটিতে যে সমস্ত সাহিত্য আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে তার মধ্যে আমার অন্যতম প্রিয় আন্দোলন অবশ্যই হারলেম রেনেসাঁস। আমেরিকার হারলেম অঞ্চল থেকে উঠে আসা এই আন্দোলন আনুমানিক ১৯১৭ থেকে গোটা বিশের দশকে তার প্রতিপত্তি বিস্তার করে, আবার স্তিমিত হয় ১৯৩০ এর দশকেই। কৃষ্ণাঙ্গ শিল্প- সাহিত্যের সোচ্চার সেলিব্রেশন হয়ে উঠেছিল হারলেম রেনেসাঁস। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, নির্দিষ্ট সাহিত্য বা শিল্পের ফর্মকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলনের উৎপত্তি হয়নি, তবে বেশ কিছু আমেরিকান স্কলার বলতে চেয়েছেন, জিন টুমারের লেখা কৃষ্ণাঙ্গদের কেন্দ্র করে নাটক,কবিতা ও উপন্যাসের সংকলন ' Cane' কিছুটা হলেও অনুপ্রাণিত করেছিল হারলেম অঞ্চলের সেই সমস্ত শিল্পী সাহিত্যিকদের যাঁরা পরবর্তীতে যুক্ত হয়েছেন এই আন্দোলনে।


হারলেম রেনেসাঁসকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয়েছে বেশ কিছু লিটল ম্যাগাজিন যার প্রকাশ বিন্যাসের সঙ্গে বিশ শতকের জাইন আন্দোলনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এই পত্রিকাগুলি শুধুমাত্র গল্প বা কবিতা প্রকাশেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রকাশিত হয়েছে কৃষ্ণাঙ্গদের সমাজ-ভাবনা বিষয়ক প্রবন্ধ যা বর্তমানে ব্ল্যাক লিটারেচার চর্চার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কৃষ্ণাঙ্গদের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হলেও এই সমস্ত পত্রিকায় যেমন স্থান পেয়েছে তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত লেখকদের ( পড়ুন শ্বেতাঙ্গ) বক্তব্য তেমনই তাঁরা ভয়ডরহীন ভাবে সমালোচনা করেছেন কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের কাজের। লিটল ম্যাগাজিনের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই প্রতিষ্ঠিত কৃষ্ণাঙ্গ লেখকদের পাশাপাশি জায়গা পেয়েছেন তরুণেরা, যাঁদের সমষ্টিগত প্রচেষ্টা কিছু ক্ষেত্রে পত্রিকার আঞ্চলিক গণ্ডি পার করে ছড়িয়েছে জাতীয় স্তরেও।


১৯২০ মানেই বিশ্ব লিটল ম্যাগাজিনে মডার্নিজমের দাপট। ফলে হারলেম রেনেসাঁসে উদ্বুদ্ধ পত্রিকাতেও ফুটে ওঠে মডার্নিজমের প্রতিচ্ছবি। সেই সময়ে এই পত্রিকাগুলি সম্পর্কে আমেরিকাবাসীরা ছিলেন দ্বিধাবিভক্ত। কেউ কেউ মনে করতেন হারলেম রেনেসাঁস লিটল ম্যাগাজিনগুলির একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান থাকাটা জরুরি আবার কারোর মতে পত্রিকার কন্টেন্টকে হতে হবে ' আর্ট ফর দ্য সেক অফ আর্ট '। যদি এই পত্রিকাগুলি একটু উলটে পালটে দেখা হয়, দেখা যাবে কিছু লেখায় যেমন ফুটে উঠছে রাজনীতির ছোঁয়া, তেমনই কিছু লেখা বিশুদ্ধ শিল্প। আসলে লিটল ম্যাগের লেখকরা তো কোনো নির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে লেখেন না। তাঁদের লেখা স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাধীন। ফলে একটি পত্রিকা যে আন্দোলনেরই মুখপত্র হোক না কেন, তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট বোধ হয় সব সময়েই জটিল।




 
হারলেম রেনেসাঁসে অনুপ্রাণিত হয়ে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ' দ্য মেসেঞ্জার '। সম্পাদক চ্যান্ডলার ওয়েন ও এ. ফিলিপ র‍্যানডল্ফ- এর হাত ধরে আত্মপ্রকাশ ১৯১৭ তে। এই পত্রিকা যেমন প্রকাশ করেছে কৃষ্ণাঙ্গদের সৃজনশীল লেখা তেমনই আলোচনার স্বার্থে জায়গা দিয়েছেন বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক ও সমাজকর্মীদের। হারলেম থেকে আঞ্চলিক ভাবে প্রকাশিত হলেও ধীরে তাঁদের ব্যপ্তি ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ইউনাইটেড স্টেটস- এই। আমার কেন জানি না মনে হয়, ' দ্য মেসেঞ্জারের ' খ্যাতি মূলত রাজনীতিক মার্কাস গারভের বিরোধিতা ও রাজনৈতিক কেরিয়ার শেষ করে দেওয়ার জন্যেই। এই পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যা বর্তমানে ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে সংরক্ষিত আছে দ্য হাইতি ট্রাস্ট ডিজিটাল লাইব্রেরিতে।

ডব্লিউ. ই. বি. ডুবয়

 
হারলেম রেনেসাঁস লিটল ম্যাগাজিন ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন সাংবাদিক ডব্লিউ. ই. বি. ডুবয়। বিশের দশকের আগেই নিজের লেখালেখির মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গ মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন ডুবয়। বিশের দশকে যে সমস্ত হারলেম রেনেসাঁস লিটল ম্যাগ প্রকাশ পেয়েছে তার অনেকগুলিতেই উপদেশক হিসেবে পাওয়া যায় তাঁর নাম, যাঁর সবচেয়ে বড়ো প্রভাব চোখে পড়ে ' দ্য ক্রাইসিস ' এর পাতায়। অবশ্য বিশের দশক যত অতিক্রান্ত হয়েছে, হ্রাস পেয়েছে ডুবয়ের মতাদর্শ, পত্রিকাগুলিতেও কমেছে তাঁর প্রভাব। কারণ এই সময়ের কৃষ্ণাঙ্গ লেখকেরা ভাগ হতে শুরু করেছেন দু'টি ভিন্ন মতাদর্শগত শিবিরে --- ' আর্ট ফর দ্য সেক অফ আর্ট ' এবং ' আর্ট এগজিস্টিং ফর দ্য সেক অফ পলিটিকাল স্টেটমেন্ট'।




 
' অপরচ্যুনিটি : আ জার্নাল অফ নিগ্রো লাইফ ' এর আত্মপ্রকাশ ১৯২৩ ন্যাশনাল আরবান লিগের হাত ধরে যাঁরা তুলে ধরতে চেয়েছিলেন হারলেম রেনেসাঁস এর সাহিত্য ও সংস্কৃতি। পত্রিকার নামেই উঠে আসে তাঁদের অভিষ্ট লক্ষ্য --- ' সুযোগ ' যে সুযোগ শুধু শিল্পে- সাহিত্যে নয়, জীবন ও শিক্ষা ক্ষেত্রেও। যখন সমসাময়িক বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে দেখা যাচ্ছে তত্ত্ব ও সমালোচনা ভিত্তিক প্রবন্ধের রমরমা তখন ' অপরচ্যুনিটি ' বেছে নিয়েছিল তথ্য ও গবেষণা ভিত্তিক পথ। পত্রিকার সম্পাদকীয় পড়লে মনে হতে পারে তাঁদের প্রকাশনার উদ্দিষ্ট লক্ষ্য শুধুমাত্র কৃষ্ণাঙ্গরাই নন, আমেরিকার স্বেতাঙ্গ মধ্যবিত্তদেরও একটি বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছেন। এই ধারনা আরও প্রবল হয়ে ওঠে যখন দেখা যায় পত্রিকার পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে রয়েছেন রুথ স্ট্যান্ডিশ বাল্ডউইন নামক এক শ্বেতাঙ্গ নারীও। ' অপরচ্যুনিটি ' র যাবতীয় সংখ্যা ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে সংরক্ষিত আছে আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে।



ফায়ার!!এর সূচি ও প্রচ্ছদ 

 
লিটল ম্যাগাজিন ' ফায়ার!! ' এর আত্মপ্রকাশ, বলা ভালো একমাত্র সংখ্যার প্রকাশ ১৯২৬ সালে, যা ব্ল্যাক লিটারেচার ইতিহাসের একটি দৃষ্টান্তমূলক উপস্থাপন। সম্পাদকমণ্ডলীতে ছিলেন ওয়ালেস থারম্যান, ল্যাঙস্টন হিউগস, অ্যারন ডগলাস, ব্রুস নাজেন্ট, গোয়েনডলিন বেনেট ও জন পি. ডেভিস। প্রথম থেকেই ' ফায়ার!!' এর গোষ্ঠী ছিল অর্থনৈতিক ভাবে অসচ্ছল। পত্রিকার আত্মপ্রকাশের অব্যবহিত পরই দপ্তরে আগুন লাগায় নষ্ট হয়ে যায় তাঁদের বেশিরভাগ সংখ্যা। এই ভয়াবহ আকস্মিক দুর্ঘটনা থেকে আর কোনোদিনই ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি এই পত্রিকা। প্রবন্ধ ও উপন্যাসের পাশাপাশি তাঁরা সময়ানুপাতে এমন সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন যা সেই সময়ে আমেরিকান সমাজের কাছে ছিল ট্যাবু। হোমোসেক্সুয়ালিটি, বাইসেক্সুয়াকিটি, বেশ্যাবৃত্তি, বর্ণবৈষম্যের মতো বিষয় আলোচিত হয়েছিল তাঁদের আত্মপ্রকাশ সংখ্যাতেই।



ফায়ার!! এর পৃষ্ঠায় প্রকাশিত অলংকরণ

 
হারলেম রেনেসাঁস এর সবচেয়ে বড়ো প্রতিবন্ধকতা ছিল তাঁদের নেতৃত্বের দিশাহীনতা। কোন পথে এগোলে ভালো হয় সেটাই তাঁরা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। ' ফায়ার!!' এর একমাত্র সংখ্যাটি ডিজিটাইজ করেছেন POC Zine Project যদিও এটির পুনর্মুদ্রিত কপি এখন বিশ্বব্যাপী উপলব্ধ।

হারলেম রেনেসাঁসকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত আরও কিছু লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে উঠে আসে ' দ্য ক্রাইসিস ' কিংবা হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের ' স্টাইলাস ' এর নাম। যা নিয়ে পরবর্তী কোনো সময়ে আলোচনার ইচ্ছে রইলো।


 জিন টুমারের লেখা কৃষ্ণাঙ্গদের কেন্দ্র করে নাটক,কবিতা ও উপন্যাসের সংকলন ' Cane' 




Comments