।। মহারাষ্ট্রের সাহিত্য, প্রতিবাদ ও কার্যক্রম ।।

লেখক : কুমার কেতকর। 
অনুবাদ : সুশোভন রায়চৌধুরী


যে সংস্কৃতি মারাঠি লিটল ম্যাগাজিন বহন করে আসছে প্রচার করছে যে সমান্তরাল ও সময়ানুপাতিক সাহিত্যের ধারা তাকে মিনি রেনেসাঁস বললেও ভুল হবে না। কারণ ইন্টেলেকচুয়াল ডিসকোর্স হোক, সমাজ সংস্কারমূলক আন্দোলন হোক অথবা রাজনৈতিক মতাদর্শের গঠন সব কিছুই বিগত শতকের প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে করে গিয়েছে লিটল ম্যাগাজিন। ১৯৭০ এর দশকে আন্দোলনের গতিপথে দেখা দিল খামতি যার অন্যতম কারণ নিঃসন্দেহে ভারত সরকারের ইমার্জেন্সি ঘোষণা। বলতে পারেন, ইমার্জেন্সি তো সারা দেশ জুড়েই ছিল তাতে কি বাংলা, মালায়লম বা তামিল ' লিটল' এর ক্ষেত্রে তেমন কিছু পার্থক্য ঘটেছে ? ঠিক, তাঁদের ক্ষেত্রে না ঘটলেও মারাঠি লিটল ম্যাগাজিনে ঘটেছে। সেই স্রোত, সেই কোলাহল, সেই উন্মাদনা এখন বাসা বাঁধে ষাটোর্ধ কিছু মানুষের নস্টালজিয়ায়। মারাঠি লিটল এর বৈভব এখন ফসিল যাকে পরবর্তী প্রজন্ম দেখতে পছন্দ করে কালচারাল মিউজিয়ামের শো-কেসেই।


বর্তমান প্রজন্ম যে সাহিত্যের ফর্ম, কনটেন্ট, স্টাইল ও এক্সপ্রেশন নিয়ে একেবারেই পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন না তা নয়, কিন্তু সেটিকে যদি বিশের দশকের মিনি রেনেসাঁস কিংবা ষাটের দশকের প্রকৃষ্ট বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করি, বলতে বাধ্য হবো, দুধের স্বাদ কখনো ঘোলে মেটে না। আমার মনে হয় লিটল ম্যাগাজিনের পাঠক বা লিটল- কে কেন্দ্র করে যে সমস্ত বিতর্ক দানা বেঁধেছে প্রিন্ট মিডিয়ায় তা এখন সামগ্রিক ভাবে চলে ডিজিটাল স্পেসে। ফেসবুকের লকড প্রোফাইলের আড়ালে গ্রুপ বানিয়ে চলে তোষামোদি আলোচনা যেখানে গোষ্ঠী ও ব্যক্তি কেন্দ্রকতাই হয় মুখ্য। আমার মনে হয় বর্তমানে কাগজে ছাপা মারাঠি লিটল ম্যাগাজিনের তুলনায় গতানুগতিকতা বিরোধি কাজ হচ্ছে মারাঠি থিয়েটার ও সিনেমায়। তাঁরা এখনো মেরুদণ্ড সোজা রেখে বহন করে চলেছেন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার ধারা।


যে লিটল ম্যাগাজিন এক সময়ে মারাঠি সংস্কৃতিকে উপহার দিয়েছে লেখক, কবি, সমালোচক ও তুখোড় সাংবাদিক, তারা এখন সত্যিই ব্যাকফুটে। টেক স্যাভি তরুণ প্রজন্ম, যাঁরা হয়তো ব্যক্তিগত ভাবে সাহিত্য নিয়ে চালাচ্ছেন নানান এক্সপেরিমেন্ট, হয়ে পড়ছেন দ্বিধান্বিত প্রকাশের পর্যায়ে। এটাকে অভিজ্ঞতার অভাব বলবো নাকি সমসাময়িক ট্রেন্ডের বিরুদ্ধে না যাওয়ার প্রবণতা? জানি না। বুঝে উঠতে পারি না ঠিক মতো। আমার খুব জোরালো ভাবেই মনে হয় তাঁদের কাজ চলছে এক ইডিওলজিকাল ভ্যাকুয়ামে। আমি চাই সমান্তরাল থেকে উত্তর - আধুনিক, অনুশীলন থেকে আসুক মেধার দাপট।


বিশের দশক বলুন অথবা ষাটের দশক, মারাঠি লিটল ম্যাগাজিনের পালা বদলে ছিল পাশ্চাত্য তত্ত্ব ও দর্শনের রমরমা। ১৯১০ থেকে ১৯৪০ কে বলি কালচারাল স্কিজোফ্রেনিয়া। বিশ শতকের যে শিক্ষানীতি তা তো পুরোপুরি ভাবেই Macaulay সিস্টেম। ছাত্র ছাত্রীরা তখন আকৃষ্ট ইংরেজি ভাষায়। শেক্সপিয়ার থেকে শেলি, মিল থেকে ম্যাকাওলে এঁরাই তখন ধ্যান- জ্ঞান - প্রাণ। পাশিপাশি ছিল বর্ণ বৈষম্য। Macaulay - র ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে, এই সময়ের মারাঠি যুব- সম্প্রদায় ছিল, ' a class of persons, Indian in blood and colour, but English in taste, in opinion, in morals and in intellect. ' যদিও জবরদস্তি চাপিয়ে দেওয়া ভারতীয় দর্শন ও সংস্কৃত ভাষার পাঠ তাঁরা অগ্রাহ্য করতে পারেননি।


যুব সমাজের এই দ্বৈত চরিত্রের ফলে দু' টো আলাদা প্রবণতা চোখে পড়ে। একদল প্রমাণ করতে চায়, যতই ভারতীয় দর্শনে পাশ্চাত্য নন্দনতত্ত্ব ঢুকে পড়ুক না কেন, দেশীয় টেক্সট কোনো কালেই পাশ্চাত্য দর্শন চর্চা থেকে কম যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে ব্রিটিশ দর্শন থেকে অনেকাংশেই বেশি। আর দ্বিতীয় দলটি পরিত্যাগ করে ব্রাহ্মণ্যবাদী মনুবাদকে। তাঁদের কাছে এগুলি ব্যাকডেটেড। তাঁরা মনে করেছেন, পাশ্চাত্য শিক্ষাই হলো প্রকৃত শিক্ষা! এর মধ্যে প্রথম দল প্রকাশ করতে শুরু করলো বিভিন্ন পত্র- পত্রিকা, গঠন করলো গোষ্ঠী। যাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য ভারতীয় দর্শনের প্রচার ও প্রসার। এরই বিরুদ্ধাচরণে নেমেছিল দ্বিতীয় গোষ্ঠী যাঁদের বক্তব্য, ব্রিটিশ সংখ্যায় যতই কম হোক না কেন শাসন করেছে সম্পূর্ণ বিশ্ব। তাঁদের পদ্ধতি, তাঁদের আইন, তাঁদের প্রজ্ঞার জোরে!


বিশ শতকের প্রথমার্থে যে সমস্ত পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে এই একই ট্রেন্ড চোখে পড়বে। প্রথম দল, পুরোনো বইয়ের পাহাড় খুঁড়ে যখন উদ্ধার করে আনছে দুষ্প্রাপ্য ভারতীয় দর্শন বিষয়ক লেখা তখন দ্বিতীয় দলের বক্তব্য, ধ্রুপদী সাহিত্যের নামে মান্ধাতার আমলের জিনিস দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না, পাশ্চাত্য তত্ত্বকে কাউন্টার করবার মতো সমসাময়িক কিছু দেখাতে পারলে বলুন। দুটো গোষ্ঠীতেই কিন্তু ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষায় সমান পারদর্শী মানুষ ছিলেন। ' ভারতীয় ঐতিহ্য বনাম পাশ্চাত্য আধুনিকতার ' দ্বৈরথ মারাঠি সাহিত্যের প্রভূত উন্নতি না করলেও ঋদ্ধ করেছে ভাষার ভাণ্ডারকে। ১৯১০ থেকে ১৯৪০, স্বাধীনতা আন্দোলনের পারদ যত চড়েছে, গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের মাত্রাও বেড়েছে ততধিক। নিজেদের বক্তব্যকে তুলে ধরতে তখন দু' পক্ষই কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন, প্রকাশ করেছেন একের পর এক পত্রিকা। এখানে একটা কথা না বললেই নয়। দুই গোষ্ঠীর নেতৃত্ব কিন্তু বামুনদের হাতেই ছিল। কখনোই কোনো তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়নি, ফলে গ্রামগঞ্জের বৃহত্তর জন মানসে এর কোনো প্রভাব পড়েনি, থেকে গিয়েছে কাগজে লেখা কিছু চর্বিতচর্বন হিসেবেই।


মারাঠি মানুষের মনে যদি কোনো আন্দোলন স্থান পেয়ে থাকে তবে তা জ্যোতিরাও ফুলে- র নেতৃত্বে চতুর্বর্ণ বিরোধি আন্দোলন। ঘটেছে অনেক আগেই, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। জ্যোতিরাও ফুলে শুধু নাটক, কবিতা, প্রবন্ধ আর রাজনৈতিক স্লোগান লেখবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি হয়ে উঠেছিলেন গরীব, খেটে খাওয়া অতিসাধারণ নিম্নবর্গীয় মানুষের প্রতিনিধি। তিনি উৎখাত করতে চেয়েছেন মহারাষ্ট্রের বুকে বর্ণবৈষম্যমূলক প্রথা। তিনি অনুভব করেছিলেন, যদি সমাজকে পরিবর্তন করতে হয় তবে সবার আগে হতে হবে সেই সমাজের অঙ্গ। তাঁর মনে হয়েছিল, যদি মহারাষ্ট্র থেকে বিদায় জানাতে হয় বর্ণবিদ্বেষকে তবে হাতিয়ার হতে পারে ব্রিটিশ শাসন। কারণ ব্রিটিশদের কৃষ্ণাঙ্গ বিদ্বেষ থাকলেও, ধর্মের নামে জাতপাতের বিভেদকে তাঁরা প্রশ্রয় দিতেন না। পরবর্তীতে জ্যোতিরাও ফুলেকেই মানুষ 'মহাত্মা' বলে সম্মান করেছেন। হ্যাঁ, মোহনদাস গান্ধির উপাধি লাভের অনেক আগেই। তাই এক অর্থে মারাঠি ভাষার সমান্তরাল সাহিত্যের প্রণেতা বলতে আমি জ্যোতিরাও ফুলেকেই বুঝি। তাঁর ' প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা ' যতটা না ব্রিটিশদের প্রতি ছিল তার চেয়ে ঢের বেশি ছিল ভারতীয় ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে, যে ক্ষমতাতন্ত্র মানুষের মধ্যে ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি করে, বর্ণের নামে মানুষকে বলে অচ্ছুৎ!

জ্যোতিরাও ফুলে

 
বিশ শতকের প্রথমার্থে ব্রাহ্মণ স্কলাররাও কিন্তু ' পাশ্চাত্য বনাম ভারতীয় ' দর্শনের দ্বন্দ্বে অংশগ্রহণ করেছেন। মহাত্মা ফুলের হাত থেকে যে ব্যাটন তুলে নিয়েছিলেন দাদাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর। খুব কম সংখ্যক মারাঠি পাঠক আজ মনে রাখেন, মহাত্মা ফুলে তাঁর একটি নাটক উৎসর্গ করেছিলেন সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে অবস্থিত আমেরিকা নামক এক দেশের রাষ্ট্রপতি অ্যাব্রাহাম লিনকনকে। কেন ? কারণ, লিনকন তখন তাঁরই মতো জোটবদ্ধ করছেন শ্রমিক ও নিম্নর্গীয় মানুষদের, বিদ্বেষমূলক দাস প্রথার বিরুদ্ধে। অ্যান্টি এস্টাবলিশমেন্ট ও সমান্তরাল মারাঠি সাহিত্যের DNA তে তাই জ্যোতিরাও ফুলে নামক স্ট্যাম্প রয়েই যায়। যার পরবর্তীতেই আছেন ভীমরাও আম্বেদকর তাঁর সম্পাদিত ' বহিস্কৃত ভারত ' পত্রিকার মাধ্যমে। আজকের আধুনিক ' দলিত সাহিত্য আন্দোলন ' তাঁর কাছে চিরঋণী। ফুলের গঠিত আন্দোলনের শতবর্ষ পরে আমরা পেয়েছি ' দলিত প্যান্থার ' দের, যাঁদের কাছে ফুলে ও আম্বেদকর দু' জনেই প্রণম্য।

বাঁদিকে 'মুকনায়ক ' ( জাতীয়তাবাদী ) ও ডানদিকে বহিস্কৃত ভারত ( দলিত সাহিত্য )
দুটি পত্রিকারই সম্পাদক বি আর আম্বেদকর



দলিত প্যান্থার

 
সাল ১৯৭২। মারাঠি ' দলিত প্যান্থার ' আন্দোলনের পারদ এতটাই চড়লো, যে তাঁরা আলোচিত হলেন আমেরিকান লিটল ম্যাগাজিনে। অনেকে মনে করেন রাস্তায় নেমে রাজনীতির ঢঙে মিটিং মিছিলই জুগিয়েছিল আন্দোলনের অক্সিজেন। তাঁদেরকে শুধু এটুকুই মনে করাবার, দলিত প্যান্থাররা রাস্তায় নামলেও তাঁদের মুখ্য প্রতিবাদ ছিল লিখিত --- লিটল ম্যাগাজিনে অথবা প্যামফ্লেটে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি যেমন নামদেও ধসাল, রাজা ঢালে কিংবা দয়া পাওয়ার প্রত্যেকেই হলেন আভাঁ গার্দে উদ্বুদ্ধ কবি। এঁদের নেতৃত্বে দলিত আন্দোলনের চরিত্র এতটাই উগ্র হয়ে ওঠে যে তৎকালীন মেইনস্ট্রিম পত্র- পত্রিকা তটস্থ হয়েছিলেন ভয়ে। এই আন্দোলন জন্ম দিয়েছে নতুন ইডিয়ম, নতুন এক্সপ্রেশন, নতুন অভিজ্ঞতা, সর্বপরি নতুন ভাষার। বলা ভালো বামুনদের হাত থেকে মারাঠি সাহিত্যের লাগাম ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন তাঁরা।

দলিত প্যান্থার পত্রিকা

 
লক্ষ করে দেখুন, যে কোনো সমান্তরাল সাহিত্য আন্দোলন, তা সে উচ্চবর্ণীয়দেরই হোক না কেন চরিত্রগত ভাবে প্রতিষ্ঠানবিরোধি। কিন্তু মুশকিল হলো, মারাঠি লিটল ম্যাগাজিন কর্মীরা ' প্রতিষ্ঠান ' কে সমান ভাবে গ্রহণ করেননি। কারোর কাছে কংগ্রেস সরকার ছিল প্রতিষ্ঠান / শত্রু আবার কারোর কাছে ' প্রতিষ্ঠান ' হয়ে দাঁড়ায় সেই চিরাচরিত ব্রাহ্মণ্যবাদ। তাঁরা কেউ এটা বোঝেননি, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার প্রকৃত অর্থ সাহিত্যের একটি প্রতিষ্ঠিত ফর্মকে ভেঙে নতুন ফর্মের গঠন। তখনকার তরুণ লিখিয়েদের মধ্যে এমন একটা ধারনা তৈরি হয়েছিল, যেন মাসিক পত্রিকা ' সত্যকথা' তে লেখা বেরুলেই মোক্ষ লাভ হবে, তাঁরা রাতারাতি হয়ে যাবেন কবি। ' সত্যকথা ' ছিল আধুনিক, লিবারাল ও সিরিয়াস কিন্তু কোনোদিনই সমাজ ও রাজনীতির পাড়ায় হাঁটেনি। প্রশ্ন, রাজনীতি মুক্ত লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন কি ভারতের মাটিতে হয়েছে ? পার্টি মুখপত্রের কথা বাদ দিলাম, এরকম কোনো ' লিটল ' আছে যা সম্পূর্ণ ভাবেই অ্যাপলিটিক্যাল, যাতে সাহিত্য রাজনীতির ন্যূনতম ছাপ খুঁজে পাওয়া যাবে না ? ফলে স্বাভাবিক ভাবেই পলিটিকাল লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন ভাঙতে উদ্দত হয়েছিল ' সত্যকথা' র একাধিপত্য।


' সত্যকথা ' ছিল একটি ধারার প্রবর্তক। নতুবা কবি বি.এস. মারধেকর, গঙ্গাধর গাডগিল, অরুণ কোলাতকর, জি. এ. কুলকার্নি, আর.কে. যোশী বা বিলাশ সারঙ্গের মতো প্রতিষ্ঠানবিরোধি লেখকেরা কেন সরব হবেন, গুরুত্ব দেবেন ' সত্যকথা' কে? কবি বি.এস. খান্ডেলকরের রোমান্টিসিজম কিংবা রবিকিরণ মণ্ডলের পদ্য ছন্দ ১৯৫০ পূর্ববর্তী মারাঠি সাহিত্যে যে ধারার সূত্রপাত করেছিল, সেটিকেই এই পত্রিকা ভেঙেছে তার অস্তিত্ববাদ, বাস্তবতা ও উত্তর আধুনিক তত্ত্বের সাহায্যে। মজার বিষয় ' সত্যকথা' র যখন আত্মপ্রকাশ ঘটে তখন তত্ত্বের থেকেও বিপ্লবীসুলভ রাগী গদ্যের মধ্যে তাঁরা মনোনিবেশ করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পত্রিকাটি এত জনপ্রিয়তা পেল যে কোনো লেখকের লেখা যতক্ষণ না এতে প্রকাশিত হচ্ছে ততক্ষণ তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটেছে বলে পাঠক ধরতে চাইতেন না। এই প্রাতিষ্ঠানিকতাকেই চ্যালেঞ্জ করেছিল সমসাময়িক লিটল ম্যাগাজিন। সার্কুলেশন কম, নেই পুঁজি, অনিয়মিত ভাবে প্রকাশিত অচেনা অজানা লেখকের লেখায় সমৃদ্ধ পত্রিকাগুলোই এক সময়ে হয়ে উঠেছে মারাঠি সাহিত্যে আলোচনার বিষয়। বন্ধ হওয়ার কিছু দিন আগে স্বয়ং সত্যকথা কেও স্বীকার করতে দেখা গেছে বাকি লিটল ম্যাগাজিনের কৃতিত্বের কথা।


মারাঠি লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনটিও ভাগ হয়েছে দুই শিবিরে। এক শিবির যখন মনে করেছে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সমাজ সংস্কারই হলো প্রকাশনার প্রথম কাজ, উদ্বুদ্ধ হয়েছেন ফুলে ও আম্বেদকরের আদর্শে অপর শিবির তখন অনুপ্রাণিত মার্ক্সবাদ, নকশালবাদ ও মাওবাদে। খুব কম সংখ্যক হলেও এমন এক তৃতীয় গোষ্ঠীর উদয় হয়েছিল যাঁদের লেখকেরা মনে করেছেন, লেখকদের কোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নেই, তাঁরা হলেন ' উন্মুক্ত আত্মা '!


যে আন্দোলন ষাট ও সত্তরের দশকে তাণ্ডব করে বেরিয়েছে মহারাষ্ট্রের বুকে হঠাৎ করেই আশির দশকে হয়ে পড়লো আস্তমিত। যার কয়েকটি কারণের মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ মেইনস্ট্রিম পত্রিকা যেমন Sunday ধরে ধরে ভাঙাতে থাকলো সেই সমস্ত লেখক যাঁরা এতদিন শুধু লিটল এই লিখে এসেছেন। যেহেতু লেখক গোষ্ঠী একই তাই সাহিত্যের চরিত্রে খুব একটা পার্থক্য দেখা দিচ্ছিল না। আর একটি কারণ অবশ্য ১৯৭৭ এর নির্বাচনে কংগ্রেসের হার ও বিজেপির ক্ষমতা দখল। কংগ্রেস হেরেছিল অ্যান্টিইনকাম্বেন্সির জন্যে। সেই সময়ে লিটল ম্যাগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বেশির ভাগ লেখকই হয়ে পড়েছিল অ্যান্টি কংগ্রেস যার একটি বড়ো অংশ হয় ঝুঁকে পড়েন সমাজবাদী পরিবারের দিকে নয় হয়ে পড়েন লিবারেটেরিয়ান পন্থী। ফলে মারাঠি লিটল ম্যাগাজিনে রাজনীতির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাজার হলেও ষাটের দশক ছিল সারা পৃথিবী ব্যাপী হিপ্পি ও বিটলসের দশক, ছিল যুদ্ধবিরোধি আন্দোলন ও কাউন্টার- কালচার গ্রুপ, পথ নাটিকা থেকে সমান্তরাল সিনেমা, নারীবাদ, পরিবেশ ভাবনা, Jazz থেকে Black Music যার সবই প্রভাব ফেলে মারাঠি লিটল ম্যাগাজিনে। অথচ সত্তরের শেষে বা আশির দশকের শুরুতে দেখা গেল যাঁরা একসময় গাইতেন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জয়গান, তাঁরাই বেছে নিলেন গতানুগতিকতার পথ। এই পথই জন্ম দিল এক প্রতিষ্ঠানের যে প্রতিষ্ঠান ছিল জিনস, ব্রা- লেস টপ, লম্বা চুল, ভাষায় স্ল্যাং ও উন্মুক্ত যৌন সম্পর্ক সর্বস্ব। আমেরিকার বুর্জোয়া NGO নেটওয়ার্ক আর এই নব্য আধুনিকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনি।


বিগত দু' দশকে ঘটে গিয়েছে বিপ্লব। শুধু সামাজিকতা বা সম্পর্কের নয়, মিডিয়া থেকে রাজনীতি সর্বত্রই এর প্রভাব দৃশ্যমান। বাম ও দক্ষিণ পন্থার সংজ্ঞা এতটাই বদলে গিয়েছে যে কে কখন কার ভাষা ও তত্ত্ব ব্যবহার করছেন, তাঁরা নিজেরাই বুঝতে পারেন না। হঠাৎ করেই আমাদের শিক্ষিত যুব সমাজে ' হিন্দুত্ব ' নামক উগ্র সাম্প্রদায়িকতা এমন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে যে মাঝে মধ্যে নিজেকেই জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করে, এখনো মহারাষ্ট্রেই আছি তো? যে গ্লোবালাইজেশন স্বপ্ন দেখিয়েছিল বিশ্বমানবতার, এক কাঁটাতারহীন পৃথিবীর সেই গ্লোবালাইজেশনই এখন সবচেয়ে বড়ো বিভাজনকারী তত্ত্ব। প্রযুক্তি থেকে প্রাপ্ত মোবাইল হোক বা সোশ্যাল মিডিয়া, যাদের কাজ হওয়া উচিত ছিল সারা বিশ্বের সাংস্কৃতিক আদান প্রদান, তারাই আজ হয়ে উঠেছে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর মাধ্যম। যে বিতর্ক হওয়া উচিত ছিল তাত্ত্বিক সেটাই পথ বদলে হয়ে পড়েছে সভ্যতার। সমসাময়িক রাজনীতি ও সাহিত্য এখন মতাদর্শহীন নেই কোনো নন্দনতত্ত্ব আর এই সব কিছুই যেন প্রকারান্তরে মারাঠি সাহিত্যের রূপরেখাটিকে তুলে ধরে। সেদিনের সেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘই আজ নব্য নাৎসি যাঁদের একদা স্বঘোষিত কম্যুনিস্ট বিরোধিতা এখন ইসলাম বিরোধিতায় রূপান্তরিত, যে ক্রুসেডকে তাঁরা নাম দিয়েছেন সন্ত্রাসবিরোধিতার! যদি বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পুঁজিবাদের স্লোগান হয়ে থাকে অ্যান্টি কম্যুনিজম তো কোল্ড ওয়ার পরবর্তী পাশ্চাত্য স্লোগানটি যে অ্যান্টি - টেররিজম তা আমরা খুব ভালো করেই জানি।


' Communist God that failed ' বলে যে ইন্টেলেকচুয়ালরা একদিন উল্লাস করেছিলেন তাঁরাই ডেকে এনেছেন কনজিউমারিজম। এঁরা ঈশ্বরকে স্থানচূত করে হতে চান ' উলঙ্গ রাজা ', ক্যাডার দিয়ে ছড়ান বিদ্বেষ বিষ করে তথ্য- প্রযুক্তিকে হাতিয়ার। ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে নরেন্দ্র মোদি হোন, কু ক্লুক্স ক্ল্যাং থেকে আরএসএস হোক অথবা নিও নাৎসি থেকে আইসিস, আমরা লিটল ম্যাগাজিন কর্মীরা এমন এক ভার্চুয়াল যুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী, যে যুদ্ধ যে কোনো মূহুর্তে লড়তে হতে পারে বাস্তবের মাটিতে। পরিশেষে এটুকুই বলবার, আমাদের মারাঠি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যে পদ্ধতিগত বিষ মেশানোর প্রক্রিয়া চলছে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে আমাদেরই, নচেৎ ধ্বংস হবে এ সভ্যতা, ধ্বংস হয়ে যাবে লিটল ম্যাগাজিন!

Comments