।। সমসাময়িক প্যান - আফ্রিকান লিটল ম্যাগাজিন ।।

সুশোভন রায়চৌধুরী

যখন তিন বছর আগে ইংল্যান্ডে ক্রিয়েটিভ রাইটিং নিয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি করছেন, কথায় কথায় ট্রয় ওনিয়াঙ্গো তাঁর বন্ধুদেরকে বলতেন আফ্রিকাতে তৈরি হওয়া কিছু লিটল ম্যাগাজিন ও বইয়ের দোকানের কথা, যাঁরা প্রতি নিয়ত সারা বিশ্বের কৃষ্ণাঙ্গ লেখক, কবি ও ফোটোগ্রাফারদের অগ্রাধিকার দিয়ে চলেছেন। ওনিয়াঙ্গো প্রতি নিয়ত খুঁজে গিয়েছেন, কীভাবে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্যে একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যায়।


 ট্রয় ওনিয়াঙ্গোর এই খোঁজ ২০২০ তে জন্ম দিল ' Lolwe ' এর, একটি অনলাইন লিটল ম্যাগাজিন যাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য সারা বিশ্বের কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্য ও শিল্পকে তুলে ধরা। পশ্চিম কেনিয়াতে অবস্থিত হ্রদ ভিক্টোরিয়াকে লুয়ো ভাষায় ' লোলওয়ে ' বলা হয়, যার অর্থ সীমাহীন জলাসয়। এই হ্রদের নামেই তরুণ ওনিয়াঙ্গো তাঁর পত্রিকার নামকরণ করেন, যেখানে এখনো পর্যন্ত বিশ্বের কুড়িটি দেশে অবস্থিত কৃষ্ণাঙ্গদের লেখা ফিকশন, নন ফিকশন, কবিতা ও ফোটোগ্রাফি প্রকাশিত হয়েছে। জুন ২০২১ এ আসে সুখবর। তাঁদের পত্রিকায় প্রকাশিত নামিবিয়ার এক বেসরকারি স্কুল ছাত্রের লেখা ছোটো গল্প, ' দ্য গিভার অফ নিক নেমস ' জিতে নেয় AKO Caine Prize for African Writing. এই পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে সেই ছোটো গল্পের লেখককে যাঁর গল্পকে বিচারকমণ্ডলী সেই বছরের সেরা ইংরেজিতে লেখা আফ্রিকান লেখকের গল্প বলে মনে করেন।

' লোলওয়ে ' সম্পাদক ট্রয় ওনিয়াঙ্গো

 ২৮ বছর বয়সী ওনিয়াঙ্গো তাঁর ছোটো গল্প ' দিস লিটল লাইট অফ মাইন ' এর জন্যে মনোনীত হয়েছিলেন, যার প্রেক্ষাপট অতি সম্প্রতি বিকলাঙ্গ হয়ে পড়া এক পুরুষ কীভাবে তাঁর একাকিত্ব ঘোচাচ্ছেন অনলাইন ডেটিং অ্যাপে রেজিস্টার করে। ওনিয়াঙ্গোর গল্পটি অবশ্য তাঁর নিজের পত্রিকা নয়, প্রকাশিত হয়েছিল নামিবিয়া থেকে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন ' Doek ' এ যার সম্পাদক Caine Prize বিজেতা স্কুল পড়ুয়া রেমি গামিজে।

ডোয়েক- এর প্রচ্ছদ 

 
ডোয়েক সম্পাদক রেমি গামিজে 

এই মূহুর্তে আফ্রিকায় তরুন লেখক ও শিল্পীদের তত্ত্বাবধানে যে সমস্ত লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হচ্ছে সেখানে যেমন প্রতিষ্ঠিত লেখকদের বক্তব্য স্থান পাচ্ছে , স্থান পাচ্ছে নবীনদের পরিক্ষা নিরীক্ষাও। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে তাঁরা ছড়িয়ে পড়ছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। যদি ঔপনিবেশিক আফ্রিকায় ' ট্রানজিশন ' তাঁদের পথ দেখিয়ে থাকে তো স্বাধীনতা পরবর্তীকালে প্রকাশিত লুটল ম্যাগাজিন ' চিমুরেঙ্গা ', ' কোয়ানি? ', ' জালাডা ', ' ব্রিটল পেপার ', ও ' জোহানেসবার্গ রিভিউ অফ বুকস ' হয়ে উঠেছে এঁদের পূর্বসূরী। সাম্প্রতিককালে ' লোলওয়ে ' ও ' ডোয়েক ' ছাড়া যে সমস্ত লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে, তাদের মধ্যে ইউএস থেকে প্রকাশিত ' ইজেল ম্যাগাজিন ' ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ' ইমবিজা জার্নাল অফ আফ্রিকান রাইটিং ' তাঁদের কনটেন্টের নিরিখে আদায় করেছে পাঠকের সম্ভ্রম।

ট্রানজিশনের কিছু সংখ্যা। 

 
কোয়ানি?  - র একটি প্রচ্ছদ 


জালাডা- র প্রচ্ছদ 

কেনিয়া থেকে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন ' ডাউন রিভার রোড ' যেমন ১৯৭৬ এ প্রকাশিত মেজা মেয়াঙ্গির উপন্যাস ' Going Down River Road ' থেকে অনুপ্রাণিত, তেমনই ' Doek ' শব্দের অর্থ কাপড় বা আফ্রিকান ভাষায় মাথার স্কার্ফ। একই সঙ্গে হতে পারে ' ডোয়েক ' তাঁদের দেশের রাজধানী অর্থাৎ নামিবিয়ার উইন্ডহোয়েকের কথা মাথা রেখে নামকরণ করেছেন? যদিও সম্পাদক গামিজে ও তাঁর সম্পাদনা সহযোগী মুতালেনি নাদিমির বক্তব্য, তাঁরা সাহিত্যকে ' visible and accessible ' ফর্মে উপস্থাপন করতে চান। তাঁরা শুধু নামিবিয়া নয় সমগ্র দক্ষিণ আফ্রিকার পাঠকের মধ্যে তৈরি করতে চান ঔৎসুক্য। সম্পাদক গামিজে বলছেন, " এতকাল আপনারা শুধু নামিবিয়ার বালির স্তুপ, সিংহ আর কালো গণ্ডারের গল্প শুনেছেন। ডোয়েকের মাধ্যমে আমরা শুধু নামিবিয়ান লেখা আফ্রিকা ও বিশ্ব দরবারে পৌঁছোতে চাইছি না নিয়ে আসতে চাইছি সমগ্র আফ্রিকাকে নামিবিয়ান সাহিত্যে। "

ডাউন রিভার রোডের প্রচ্ছদ 

আফ্রিকার সমসাময়িক লিটল ম্যাগাজিন শুধু লেখা নয় তুলে ধরছে শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমকে যা আগে আফ্রিকান ডায়াস্পোরাতে খুব একটা দেখা যায়নি। যেমন ' ডাউন রিভার রোডের ' রিচ্যুয়াল ইস্যু' তে দেখা যাচ্ছে কবিতা ছাপা নয়, সরাসরি কবিতার স্বরচিত পাঠ তাঁরা উপস্থাপন করছেন অডিও ফর্ম্যাটে। ' ডোয়েক' এর দ্বিতীয় সংখ্যায় যেমন প্রকাশিত হয়েছে Photo series on Workplace Anxiety. আবার ' লোলওয়ে' র সাম্প্রতিকতম সংখ্যায় পাওয়া যাবে সেনেগাল, আইভোরি কোস্ট ও বুরকিনা ফাসো অঞ্চলের কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের সচিত্র প্রতিবেদন যাঁদের স্বামী তাঁদেরকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন ইয়োরোপ।


 
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই তরুণ লেখকদের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত পত্র- পত্রিকার কাছে প্রতিবন্ধকতা বলতে কিন্তু সেই একই, অর্থের অভাব। তাঁরা বেশির ভাগই হয় ক্রাউড ফান্ডিং অথবা নিজের পকেটের পয়সা খরচ করেই পত্রিকা চালান। অর্থনৈতিক বোঝা কমাতে ' ডাউন রিভার রোডের ' অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফ্র‍্যাঙ্কলিন সানডে জানাচ্ছেন, অনলাইনের পাশাপাশি তাঁরা কিছু প্রিন্টেড সংখ্যা প্রকাশ করে বিক্রি করেন নাইরোবিতে। ' লোলওয়ে ' আয়োজন করে লেখক কর্মশালার আর ' ডোয়েক' কে দেখা যায় এক আঞ্চলিক ব্যাঙ্কের পৃষ্ঠপোষকতায় চলতে। তবে আফ্রিকান লিটল ম্যাগাজিনের কাল হয়ে দাঁড়ায় সম্পাদকের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা, যার দরুণ তাঁদের অনেকেই বড়ো প্রকাশনীতে কাজের সুযোগ ছাড়েন না, চলে যান ইয়োরোপ কাজের তাগিদে। ফলে বন্ধ হয় লিটল ম্যাগাজিন।


Comments