।। এথেন্স যখন হয়ে ওঠে ' নারীর শহর ' ।।

সুশোভন রায়চৌধুরী


প্রসিদ্ধ আমেরিকান নারীবাদী লিটল ম্যাগাজিন ' স্পেয়ার রিব ' - এর সম্পাদক মার্শা রোয়ে এক সময়ে বলেছিলেন, ' হঠাৎ করেই শব্দ হয়েছিল সম্ভব '। তাঁর এই উক্তি অবশ্যই সত্তরের দশকে সারা পৃথিবী ব্যাপী নারীমুক্তির পক্ষে ওঠা আয়োজনকে উদ্দেশ করেই। তখন সম্পূর্ণ রূপে নারী পরিচালিত প্রিন্ট মিডিয়ায় মেয়েরা স্বাধীন ভাবে তুলে ধরছেন তাঁদের বক্তব্য। গ্রীসের মেয়েরাও বোধ হয় এরকমই ভেবেছিল যখন নারীবাদের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়লো গ্রীসের সাত বছর ধরে চলা নারকীয় একনায়কতন্ত্রী শাসনের শেষে। ( ১৯৬৭-১৯৭৪) তবে গ্রীক মেয়েদের আওয়াজ, তাঁদের প্রতিবাদ, শিল্প ও সাহিত্যের মূল স্রোতে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করবার প্রথম পালা ঘটে গিয়েছে উনিশ শতকেই। সাময়িক পত্রের পাতায় তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি বহু আগেই দেখা গিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ১৯ নভেম্বর, ১৯০০ তে প্রকাশিত ' এফিমেরিস টন কিরিয়ন ' বা ' লেডিজ গেজেট ' কেই ধরা যেতে পারে, যাঁরা সম্পূর্ণ রূপে মেয়েদের হাতেই পরিচালিত ও মেয়েদের লেখা ছাপানোর মধ্যেই ছিল সীমাবদ্ধ। 

এফিমেরিস টন কিরিয়ন

১৯৭০ এর দশকে যখন নতুন করে আসছে নারীবাদের ঢেউ তখন গ্রীক মেয়েরা আর ইতিহাস নয়, রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব ও গণতন্ত্রকে হাতিয়ার করে গড়ে তুলছেন প্রতিরোধ। এই সময়ে বেড়েছে নারীবাদী পত্রিকার প্রকাশও। তবে তাদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের মহিলা শাখার মুখপত্র। এর বাইরে প্রকাশিত হয়েছে এমন কিছু স্বাধীন লিটল ম্যাগাজিন যাঁরা উন্নততর লেটারিং, ফোটোটাইপসেটিং ও অফসেট প্রিন্টিং এর মাধ্যমে নারীবাদী আন্দোলনে যোগ করলো শৈল্পিক মাত্রা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ' পলি গাইনাইকন : নারীর শহর --- তাত্ত্বিক ও বাস্তব পর্যালোনার উন্মুক্ত কাগজ '।

২৮×১৪ সেমি মাপের প্রচ্ছদ ( পলি গাইনাইকন) 

 
' পলি গাইনাইকন ' এর আত্মপ্রকাশ জানুয়ারি, ১৯৮২ তে। সম্পাদক টিনা মাল্লিয়াকৌ যে হঠাৎ করেই সামিল হয়েছিলেন আন্দোলনে তা নয়। তার ঠিক এক বছর আগে ১৯৮১ তে প্রকাশিত লিওনিদাস ক্রিস্তাকিস সম্পাদিত নারীবাদী লিটল ম্যাগাজিন ' ইডিওড্রোমিও ' তে দেখা গিয়েছে তাঁর লেখা। এই ক্রিস্তাকিস ছিলেন স্বনামধন্য গ্রাফিক ডিজাইনার যাঁর ওপর টিনা দায়িত্ব দেন তাঁর পত্রিকার গ্রাফিক ডিজাইনিং এর। ' পলি গাইনাইকন ' এর লে আউট থেকে লেটার কম্পোজিশন, সবই তিনি নিজে হাতে করেছেন। যদিও পরবর্তীতে পত্রিকার মাস্টহেড অনুযায়ী ক্রিস্তাকিসের পাশাপাশি নিকি কোনিদিকে দেখা গিয়েছে লেটার কম্পোজিশনের দায়িত্বে। পত্রিকার ডিজাইন থেকে ছাপা, সবই হতো এথেন্সেই। সম্পাদকমণ্ডলীতে না থেকেও পত্রিকার গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে ক্রিস্তাকিসের অন্তর্ভুক্তি সেই সময়ের গ্রীক লিটল ম্যাগাজিন পরিমণ্ডলে ছিল এক বিরল ঘটনা। বিশেষত রাজনৈতিক মুখপত্রগুলি তো কোনো ভাবেই বাইরের কাউকে পত্রিকার কাজে ঢোকাতেন না। আবার এরকম অনেক পত্রিকা দেখা গিয়েছে যাঁরা গ্রাফিক ডিজাইনিং এর জন্যে কিনে নিয়েছেন বিশেষ ধরনের মেশিন, মানুষের ওপর নির্ভরই করতেন না এই কাজে। উদাহরণ, লেসবিয়ান - নারীবাদী লিটল ম্যাগাজিন ' আমাজন কোয়ার্টারলি '। যদিও তাঁরা স্বীকার করেন, এই মেশিন মারফত পত্রিকার ডিজাইন করা খুবই জটিল বিষয়, তার চেয়ে মানুষকে দিয়ে কাজ করানো সহজ!

ভেতরের পাতার নমুনা

ভেতরের পাতার নমুনা

ভেতরের পাতার নমুনা

 ' পলি গাইনাইকন ' এর প্রকাশিত কনটেন্টে ছিল বৈচিত্রময়তা। তাঁদের লেখায় যেমন উঠে এসেছে মিডিয়াতে নারীর প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ বিষয়ক লেখা, তেমনই গ্রীক লোকশিল্প, বিজ্ঞান ভিত্তিক তত্ত্ব বিশ্লেষণ ও সমাজে নারীর চিরাচরিত ভূমিকা বিষয়ক লেখাও। এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে মেয়েদের আঁকা ছবি, কবিতা ও সাক্ষাৎকার। প্রতিটি লেখাই যেন এক সূত্রে গাঁথা, যে সূত্র বাম- বিরোধি, ফ্যাসিস্ট- বিরোধি, একান্ত ভাবেই সমাজতত্ত্ব ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্ভর। সবচেয়ে বড়ো কথা পত্রিকাটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে যখন গ্রীসের মাটিতে নারীবাদ এক পরিপক্ক দর্শন।


' পলি গাইনাইকন ' এর নামলিপি ও বেশির ভাগ হেডিং ছাপা হতো লাতিন স্ক্রিপ্ট টাইপফেসে। পত্রিকার নামাঙ্কন ছাপা হয়েছে ' Candice Bold ' ফন্টে যেটি ব্রিটিশ টাইপসেটিং কোম্পানি লেট্রাসেট তৈরি করে ১৯৭৬ সালে। বেশির ভাগ গ্রীক অক্ষর এই টাইপসেটে পাওয়া গেলেও, কিছু অক্ষরকে তৈরি করতে হতো ম্যানুয়ালি, যেমন গ্রীক অক্ষর Pi ( π) . এছাড়াও যে সমস্ত ফন্ট এই পত্রিকায় ব্যবহার হরা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে Pluto, Blanchard, Futura Black ইত্যাদি। এই সব নিরস তথ্য জানানোর কারণ একটাই। পাঠক হিসেবে আমাদের বুঝতে হবে, এই পত্রিকার প্রকাশ বিন্যাস ছিল এক কথায় অসাধ্য সাধন!


' পলি গাইনাইকন ' এর প্রচ্ছদ ও অলংকরণের ক্ষেত্রে দেখা যায় ডেনমার্কের এক নারীবাদী শিল্পীগোষ্ঠীর হাত যাঁদের মধ্যে এক অসামান্য সংযোগ তৈরি করেছিলেন নারীবাদী শিল্পী জুডি শিকাগো। এছাড়া আঞ্চলিক খবরের অলংকরণে দেখা গিয়েছে আঞ্চলিক শিল্পীর আঁকা। পত্রিকার চেহারা একটু লম্বাটে হওয়ায়, সরু কলামের মধ্যে লেখা ও অলংকরণ - এর দৃশ্য রূপ কনটেন্টকে বোধ হয় আরও বেশি ফুটিয়ে তুলেছে। প্রথম দিকে ২৮×১৪ সেমি মাপে প্রকাশিত হলেও পঞ্চম সংখ্যা থেকে তাঁদের এই চেহারার পরিবর্তন পাঠক খুব ভালো ভাবেই গ্রহণ করেছিলেন।

পঞ্চম সংখ্যা পরবর্তী পত্রিকার আকার 

 
ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৫ তে, ষোলোটি সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর বন্ধ হয় ' পলি গাইনাইকন '। শেষ সংখ্যার বিষয় ছিল, ' শহুরে মেয়েদের আগলে রাখবার অতিসজ্জ ' যা একরকম পত্রিকার নামের বৃত্তটিকেই সম্পূর্ণ করে। গ্রীসের নারী কেন্দ্রিক যাবতীয় মিথকে ভাঙবার ক্ষেত্রে ' পলি গাইনাইকন ' এর অবদান আজও এথেন্সের মেয়েরা খুব ভালো করেই মনে রেখেছে।

Comments