।। Krzysztof Kowalski - র সাক্ষাৎকার : বিক্রেতা যখন মুখোমুখি পাঠকের ।।

অনুবাদ : সুশোভন রায়চৌধুরী


যদি কখনো ' সুপারসালঁ ' র ওয়েবসাইটে ঢুকে থাকেন তাহলে অবশ্যই জানবেন, এখানে এরকম কোনো ইয়োরোপীয় লিটল ম্যাগাজিনের নাম আপনি ভেবে উঠতে পারবেন না যা বিক্রি হয়নি। পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারস - এর একেবারে কেন্দ্রে, বাঁ পাশে জুতোর দোকান আর ডান পাশে চামড়া কারখানার ঠিকে মাঝেই গড়ে উঠেছিল ' সুপারসালঁ '। এক সময়ে এখানেই চলতো চামড়া কারখানার ওয়ার্কশপ। দু' হাজারেরও বেশি বিভিন্ন ভাষার লিটল ম্যাগাজিন সম্ভবার এই দোকানকে করে তুলেছিল পোলিশ লিটল ম্যাগাজিন প্রেমীদের জন্যে এক অনিবার্য গন্তব্য। মালিক Krzysztof কওয়ালস্কি, পেশায় ফোটোগ্রাফার, তাঁর বান্ধবী Ala Gabillaud কে সঙ্গী করে সাজিয়ে বসেছিলেন লিটল ম্যাগ ও ছোটো প্রকাশনীর সম্ভার। দোকানের ট্যাগলাইনটাও ছিল চমৎকার --- ' Kiosk of Contemporary Culture. '


 
লিটল ম্যাগাজিন পাঠক, ব্রিটিশ বংশদ্ভূত জেরেমি লেসলি ২০১৫ সালে একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন Krzysztof -এর । বাংলা ছোটো কাগজ কর্মীদের জন্যে রইলো তারই তর্জমা।


জেরেমি : কবে এবং কেন আপনার মনে হয়েছিল ' সুপারসালঁ ' তৈরির কথা?


Krzysztof : ' সুপারসালঁ ' খুলি ২০১২ সালে। সেই সময়ে ওয়ারসতে এরকম একটাও দোকান ছিল না যারা লিটল ম্যাগাজিন ও ছোটো প্রকাশনীর বইপত্র রাখে। অন্তত ততধিক বা সেই ভাবে নয় যেভাবে বিষয়টাকে আমি দেখতে চেয়েছি। আমার মনে হয়েছিল, এই বড়ো বড়ো বইয়ের দোকান থেকে শুরু করে ফুটপাথের কিয়স্ক হোক বা মিউজিয়াম কোথাও একটা খামতি থেকে যাচ্ছে। বার বার মনে হয়েছে, কিছু একটা মিসিং। আমি চিরকালই প্রিন্ট কালচারের ভক্ত, বাড়িতেও ছোটো খাটো একটা সংগ্রহ আছে বলতে পারেন। একদিন অনুভব করলাম, আমার সংগ্রহের যে পত্র- পত্রিকা তা সবই হয় অনলাইনে অর্ডার করে আনানো অথবা কোথাও ঘুরতে বেরিয়ে ধুম করে কিনে ফেলা। আমার দোকান খোলবার মূল কারণ, সেভাবে কেউ গুরুত্বই দেয়নি লিটল ম্যাগাজিনকে ওয়ারসতে। প্রথম দিকে স্টক করবার সময়ে শুধু নিজের কথা ভেবেছি, আমি পাঠক হলে কোনটা কিনতাম, আমার বন্ধুরাই বা কী পছন্দ করে। দেখা গেল শুধু আমি বা আমার বন্ধুরা নয়, এই শহরে রয়েছেন বহু সমমনোভাবাপন্য মানুষ। আমাদের প্রথম লোকেশনের নির্বাচনটাই ছিল অ্যাক্সিডেন্টাল। ( এখন তো আমরা এখানে সরে এসেছি।) তখন আমি ছাত্র। আমার বাড়ি Jelenia Gora তে মায়ের বিউটি পার্লারের একটা অংশে খুললাম দোকান। পার্লার কিন্তু এখনো আছে, বন্ধ হয়নি। হা, হা। তখন দোকান সাজানোর জন্যে চলছে ছুতোর মিস্ত্রির হাতুড়ির ঠুকঠাক অথচ দোকানের নাম কী হবে সেটাই ভেবে উঠতে পারিনি। আচমকা মাথায় এল ' সুপারসালঁ '। এর ঠিক দশ বছর আগে মানে ২০০২ তে মায়ের পার্লার পেয়েছিল দেশের শ্রেষ্ঠ বিউটি পার্লারের খেতাব -- ' সুপারসালঁ '। সেখান থেকেই টুকে দিলুম আরকি! হা! হা! এক বছর ওখানেই দোকান চালানোর পর আমার গার্ল ফ্রেন্ড আলা আর আমি দু'জনে মিলে ঠিক করলাম এবার শহরের দিকে যেতে হবে, আর যাই হোক বেশি সংখ্যক কাস্টমার তো ঢুকবে দোকানে!


জেরেমি : আপনি দোকানে পত্রিকাগুলো সাজান কীভাবে, মানে সাজানোর পদ্ধতি ঠিক কী ?


Krzysztof : যেহেতু আমাদের দোকানের সাইজটা খুব ছোটো, তাই পত্রিকা এবং ছোটো প্রকাশনীর বই মিশিয়েই রাখি। বেশির ভাগ সংখ্যা এমন করে ডিসপ্লে করি যাতে কাস্টমার তার প্রচ্ছদ দেখতে পান। যে সমস্ত পত্রিকার কাটতি ভালো সেগুলোকে টেবিলে স্ট্যাক করে রাখা হয়। আমাদের এখানে যা কিছু দেখছেন সবই কিন্তু অনলাইনে হোম ডেলিভারি করা হয়। ফলে দোকানে আসবার আগে অনেক কাস্টমারই ওয়েবসাইটে দেখে নেন স্টক। প্রচ্ছদ ডিসপ্লে তো করতেই হবে। প্রচ্ছদ কি একটা বই বা পত্রিকার হয়ে কথা বলে না ?



 
জেরেমি : যদি কিছু মনে না করেন, আপনার কাস্টমার বেস কীরকম ?


Krzysztof : আমার কাস্টমার প্রধানত সৃষ্টিশীল ইন্ডাস্ট্রি প্রফেশনালস। ফোটোগ্রাফার, গ্রাফিক ডিজাইনার, এজেন্সির মালিক, উঠতি ফ্যাশন মডেল আর আপনার মতোই আভাঁ গার্দে উদ্বুদ্ধ মানুষ। দ্বিতীয় একটা গ্রুপ আছে যাঁদের কাছে লিটল ম্যাগাজিন কেনাটা হলো হবি। কেনবার পর আদৌ পড়েন বলে মনে হয় না। তাঁদের কাছে বোদ্ধা সাজাটাই মুখ্য। আর তৃতীয় গ্রুপ নিঃসন্দেহে একটা বড়ো সংখ্যক মানুষের যাঁরা বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে বই বা পত্রিকা উপহার দেবেন বলে কিনতে আসেন।


জেরেমি : আপনাকে দেখলে খুবই ভালো মানুষ বলে মনে হয়। একটা ট্রেড সিক্রেট জিজ্ঞাসা করছি, তাড়িয়ে দেবেন না প্লীজ। ( মুচকি হেসে ) এ মাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি কোন গুলোর হলো?


Krzysztof : ভালো মানুষ! হা হা হা। দেখুন স্বাভাবিক ভাবেই পোলিশ লিটল ম্যাগাজিনের সেল বেশি। এ মাসে যেমন শিল্প ও সংস্কৃতির পত্রিকা ' Sezon ' এর বিক্রি ভালো হয়েছে। ' This is Paper ' যেমন রদবদল ঘটিয়েছেন তাঁদের ডিজাইনে, পাঠক খাচ্ছেন ভালো। যদি আন্তর্জাতিক ' লিটল ' এর কথা বলেন, ' The Gentle Woman ', ' Fantastic Man ', ' Kinfolk ', ' Self Service ', ও ' Cereal ' এর বিক্রিও মন্দ নয়। 



জেরেমি : আঞ্চলিক লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে আপনার প্রিয় কোনো পত্রিকা আছে ?


Krzysztof : ফেলে দিলেন তো মুশকিলে ম্যাডাম? এ ভাবে পছন্দের পত্রিকা বলা সত্যিই কষ্টকর। কোনটা ছেড়ে কোনটার কথা বলি বলুন তো ? বিগত তিন বছর ধরে যে আমরা লিটল ম্যাগাজিন বিক্রি করছি তাতে আমার মনে হয়েছে পোলিশ লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে ঘটে গিয়েছে আমূল পরিবর্তন। বহু সংখ্যক মানুষ এগিয়ে আসছেন ' লিটল ' প্রকাশের মাধ্যমে। সাম্প্রতিক কিছু পত্রিকা যেমন Futu, Usta, Smak, Zwykle, Zycie, Fathers, F5, This is Paper, Sezon, Kukbuk,Label, & Living, Szum, Rzut, DIK Fagazine, 2+3DPrint Control নজর কেড়েছে। আসল কথাটা কি জানেন তো ? পোল্যান্ডে প্রিন্ট এখনো মরে যায়নি। বরং আরও উন্নতি করছে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে।



 
[ আরে! তখন থেকে শুধু কথাই বলে যাচ্ছি, আমাদের জন্যে কফি এসে গিয়েছে। আসুন একটু গলা ভিজিয়ে নেই। কুকিজ? ... নো থ্যাঙ্কস। ]


জেরেমি : যদি জিজ্ঞেস করি আপনার কাজের সবচেয়ে বড়ো প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে ?


Krzysztof : একেবারে প্রথম দিকের চ্যালেঞ্জ ছিল দোকানে ঠক মতো স্টক ঢোকানোর, এটা মাথায় রেখে যেন দেউলিয়া না হয়ে যাই। এখনকার চ্যালেঞ্জ আলাদা। সব সময় মনে হয় দোকানে শুধু এরকম পত্রিকাই রাখবো যার একটি সংখ্যা কিনে পাঠক যেন আবার ফিরে আসেন পরবর্তী সংখ্যার জন্যে। আর দেখতেই তো পাচ্ছেন, আমাদের দোকানটা খুবই ছোটো ফলে কোন পত্রিকা ডিসপ্লেতে রাখা হবে তা নির্ধারণ করতে কালঘাম ছোটে বইকি! ভালো একটা পত্রিকাকে ডিসপ্লে থেকে সরিয়ে শুধু অনলাইন ক্যাটালগে রাখবো এমন কাজ আমি করতে পারি না।


জেরেমি : শেষ প্রশ্ন। এই যে এতদিন ধরে লিটল ম্যাগাজিন নাড়াচাড়া করছেন, পত্রিকাগুলোর মধ্যে কি কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ে ?


Krzysztof : অবশ্যই। আগের তুলনায় পোলিশ ' লিটল ' এখন অনেক বেশি জোর দিচ্ছে তার কনটেন্টে। বদলেছে চিন্তা ভাবনাও। তাঁরা এখন মনে করেন, একটি সংখ্যার প্রকাশ এক বিরাট বড়ো মার্কেটিং প্রসেসের শুরু মাত্র। শেষ পর্যন্ত পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার আগে, অন্তরবর্তী টেকনিকে এখন তাঁরা পারদর্শী। আমার মনে হয় একজন ' লিটল ' সম্পাদকের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হলো প্রতি নিয়ত পাঠককে চমকে দেওয়া যাতে তাঁরা অপেক্ষা করতে বাধ্য হন পরবর্তীর সংখ্যার জন্যে। এই একই কাজ আমরা আমাদের দোকানের ক্ষেত্রেও করি, পাঠক যেন ফিরে আসেন, তৈরি হয় আত্মীয়তা।


 
Chmielna 10,00-020 Warszawa, Poland এ অবস্থিত ' সুপারসালঁ ' শেষ বারের জন্যে খুলেছিল ২০২০ সালে। কোভিড কালীন লকডাউনে তাঁরা এতটাই ক্ষতিগ্রস্থ হন, যে ' সুপারসালঁ' কে বাঁচানো আর সম্ভব হয়নি।

Comments